হ্যানিমেনের জীবনী

দৈনিক সকালের ডাক

১৭৫৫ সালের ১০ এপ্রিল ( কারো কারো মতে ১১ এপ্রিল) মধ্যরাতে জার্মান দেশের মারগ্রে ওগেট প্রদেশের অন্তর্গত মিসেন শহরে এক দরিদ্র চিত্রকরের গৃহে জন্ম হলো এক শিশুর।

দরিদ্র পিতা মাতার মনে হয়েছিল আর দশ টি পরিবারে যেমন সন্তান আসে, তাদের পরিবারেও তেমনি সন্তান এসেছে। তাকে নিয়ে ভাববার মানসিকতা ছিলনা তাদের। তাই অবহেলা আর দারিদ্রের মধ্যেই বড় হয়ে উঠল সেই শিশু।

তখনো কেও কল্পনা করতে পারেনি এই শিশুই একদিন হয়ে উঠবে আধুনিক চিকিতসা বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন ধারার জন্মদাতা, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার জনক ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেডারিখ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান। হ্যানিম্যানের বাবা গডফ্রিড মিসেন শহরের একটা চিনামাটির কারখানায় বাসনের উপর নানা নক্সা করতেন, ছবি আঁকতেন। এই কাজে যা পেতেন তাতে অতি কস্টে সংসার চলত। হ্যানিম্যান ছিলেন চার ভাই বোনের মধ্যে তৃতীয়। পিতা মাতার প্রথম পুত্র সন্তান।

গডফ্রিড এর আশা ছিল হ্যানিম্যান বড় হয়ে উঠলে তারই সাথে ছবি অংকনের কাজ করবে, তাতে হয়তো সংসারে আর্থিক সমস্যা কিছুটা দূর হবে। কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই হ্যানিম্যানের ছিল শিক্ষার প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ। বাড়িতেই বাবা মায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শুরু হল। বারো বছর বয়সে হ্যানিম্যান ভর্তি হলেন স্থানীয় টাউন স্কুলে। অল্পদিনেই তার অসাধারণ মেধার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন তার শিক্ষকরা। বিশেষত গ্রিক ভাষায় তিনি এতখানি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন যে, শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে তিনিই প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রদের গ্রিক ভাষা পড়াতেন।

টাউন স্কুলে শিক্ষা শেষ করে হ্যানিম্যান ভর্তি হলেন প্রিন্সেস স্কুলে। এদিকে সংসারে অভাব আর দারিদ্র ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠেছিল।নিরুপায় হয়ে হয়ে তার বাবা হ্যানিম্যান কে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে লিপজিক শহরে এক মুদির দুকানে মাল বেচাকেনার কাজে লাগিয়ে দিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ এই কথা জানতে পেরে হ্যানিম্যানের স্কুলের মাইনে ও অন্যসব খরচ মওকুফ করে দিল যাতে আবার হ্যানিম্যান পড়াশুনা আরম্ভ করতে পারেন। যথাসময়ে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলেন হ্যানিম্যান।

এরই মধ্যে তিনি একাধিক ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ক্রমশই তার মধ্যে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ তীব্র হয়ে উঠছিল। পিতার অমতেই লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হবার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। হাতে সম্বল মাত্র ২০ খেরল (যা আমাদের দেশের ১৪ টাকার মত)। তিনি ভর্তি হলেন লিপজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজের খরচ মেটাবার জন্য এক ধনী যুবককে জার্মান ও ফরাসী ভাষা শেখাতেন। এছাড়া বিভিন্ন প্রকাশকের তরফে অনুবাদের কাজ করতেন।

হ্যানিম্যানের এলোপ্যাথি চিকিৎসা জীবন

হ্যানিম্যানের বয়স ২২ বছর এ ঠেকল। ইতিমধ্যেই তিনি গ্রিক, ল্যাটিন, ইংরেজি, ইতালিয়ান, হিব্রু, আরবি, স্প্যানিশ এবং জার্মান ইত্যাদি প্রায় ১১টি ভাষায় যথেষ্ট পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন। হ্যানিম্যানের ইচ্ছা ছিল তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করবেন। তখন কোন ডাক্তারের কাছে তার অধীনে থেকে কাজ শিখতে হতো। লিপজিকের ভিয়েনা নগরের লিওপোল্ড চিকিৎসালয়ে কোন এক ভাল চিকিৎসক এর কাছে কাজ করার সুযোগ পেলেন।

এবার ভাষাতত্ত্ব ছেড়ে শুরু হল চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন। দুর্ভাগ্যক্রমে এই সময় তার সামান্য গচ্ছিত অর্থ একদিন চুরি হয়ে গেল। নিদারূন অর্থসংকটে পড়লেন হ্যানিম্যান। এই বিপদের দিনে তাকে সাহায্য করলেন স্থানীয় গভর্নর। তার লাইব্রেরী দেখাশুনার ভার দিলেন হ্যানিম্যানকে। এই সুযোগটি কে পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করলেন তিনি। এক বছর নয় মাসে লাইব্রেরীর প্রাত সমস্ত বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলেন তিনি। হাতে কিছু অর্থ সঞ্চয় হতেই তিনি ভর্তি হলেন আনল্যারজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এখানে থেকেই তার ধীশক্তি, অসাধারণ মেধা ও চারিত্রিক সরলতার দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ কোয়ারিনের প্রধান শিষ্য হয়ে উঠেন। ডাঃ কোয়ারিনের কৃপাদৃষ্টির ফলে ট্রান্সেলভ্যানিয়ার শাসনকর্তার চিকিৎসক নিযুক্ত হন। এই সময় তিনি ল্যাটিন ভাষায় আপেক্ষিক পীড়ার কারণ তত্ব ও ঔষুধ প্রণালীর বিবেচনা নামক একটি চিকিৎসা বিষয়ক প্রবন্ধ লিখিয়া তিনি মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে ১৭৭৯ খৃষ্টাব্দে আনলারজেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব মেডিসিন উপাধি পেলেন।

ডাক্তারি পাস করে এক বছর তিনি প্রাকটিস করার পর জার্মানির এক হাসপাতালে চাকরি পেলেন। অন্যসব বিষয়ের মধ্যে রসায়নের প্রতি হ্যানিম্যানের ছিল সবচেয়ে বেশি আগ্রহ। সেই সূত্রেই হেসলার নামে এক মেডিসিন কারবারীর সাথে পরিচয় হল। নিয়মিত তার বাড়ীতে যাতায়াত করতো। হেসলারের সাথে থাকতেন তার পালিতা কন্যা হেনরিয়েটা। হেনরিয়েটা ছিলেন সুন্দরি ও বুদ্ধিমতী।

সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে ১৭৮২ সালের ১৭ নভেম্বর হ্যানিম্যান ২৭ বছর বয়সে ১৮ বছরের সুন্দরি হেনরিয়েটা কে বিয়ে করেন। আজ এই পর্যন্ত। ধারাবাহিকভাবে হোমিওপ্যাথির জনক ড. স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের জীবনী জানতে আমাদের সাথে থাকুন। আমদের পেজ এর সব পোস্ট এ লাইক, কমেন্ট দিয়ে আমাদের পাশে থাকুন, তাহলেই আমরা আরো ভাল পোস্ট নিয়ে হাজির হবার অনুপ্রেরণা পাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares