সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে ঔষধ শিল্পে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন

নিউজ ডেস্ক

দেশের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানি রেনাটা লিমিটেড। কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবস্থায় (চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন) প্রতিষ্ঠানটির কিছু ওষুধ তৈরি করে দেয় শরীফ ফার্মাসিউটিক্যালস ও নাফকো ফার্মাসিউটিক্যালস। আবার জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ও স্যালাইন সোস্যাল মার্কেটিং কোম্পানিকে (এসএমসি) দিয়ে তৈরি করিয়ে নেয় রেনাটা। একই ব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যের একটি কোম্পানির ওষুধ উৎপাদন করে রেনাটা নিজেই।

শুধু রেনাটা নয়, ওষুধ খাতের প্রায় সব বড় প্রতিষ্ঠানই কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবস্থায় অন্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ওষুধ তৈরি করিয়ে থাকে। ব্যবস্থাটি দেশের ওষুধ শিল্পে সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন শিল্প উদ্যোক্তারা।

রেনাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এস কায়সার কবির বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং আক্ষরিক অর্থেই একটি ভালো ব্যবসা। যদিও আন্তর্জাতিক ব্যবসার ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থায় পণ্য উৎপাদনে মূল্যহার আকর্ষণীয় নয়। এক্ষেত্রে প্রতি হাজার ট্যাবলেটে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন মূল্যহার ৬-৭ ডলার।

ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনের পথটি প্রসারিত হয়েছে জাতীয় ওষুধ নীতিমালা-২০১৬ প্রণয়নের মাধ্যমে। রফতানির জন্য ২০০৫ সাল থেকেই চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেও স্থানীয় বাজারে এর ব্যাপ্তি ছিল খুবই সীমিত। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করা সম্ভব হতো না তখন। প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয়ভার বেড়ে গিয়ে ঝুঁকি সৃষ্টি হতো ব্যবসায়। ২০১৬ সালে ওষুধ নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে কন্ট্রাক্ট বা টোল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অনুমোদনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

জাতীয় ওষুধ নীতিমালা ২০১৬-তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কারখানা রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানকে মাশুল প্রদান ব্যবস্থায় (টোল ম্যানুফ্যাকচারিং) তাদের পছন্দমতো দেশীয় অন্য যেকোনো অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কারখানায় ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি দেয়া যাবে।

একই নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কারখানা নেই এমন বিদেশী কোম্পানি শুধু রফতানির উদ্দেশ্যে সর্বস্বীকৃত ফর্মুলার ওষুধ একই ফর্মুলা অনুসরণ করে এমন দেশীয় কোম্পানিকে দিয়ে কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং/লোন লাইসেন্সের আওতায় উৎপাদন করাতে পারবে। তবে উৎপাদিত ওই ওষুধ কোনোভাবেই স্থানীয় বাজারে বাজারজাত করা যাবে না।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ (বাপি) সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কন্ট্রাক্ট ও টোল ম্যানুফ্যাকচারিং একই বিষয়। একটি ব্যবহূত হয় রফতানির ক্ষেত্রে, অন্যটি স্থানীয় বাজারের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই টোল ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবস্থায় ওষুধ উৎপাদন প্রচলিত ছিল। যদিও এ ব্যবস্থার ব্যবহার ছিল সীমিত। ২০১৬ সালে ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার ব্যাপ্তি বেড়ে যায়। রফতানির ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং সুবিধাটি এখন পর্যন্ত দুটি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করতে পারছে। একটি স্কয়ার ও বেক্সিমকো। আর টোল ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবস্থাটি স্থানীয় বাজারে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রায় সব বড় প্রতিষ্ঠানই ব্যবহার করছে।

জানতে চাইলে বাপির ট্রেজারার ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সিইও মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবস্থার মূল প্রভাব হলো এক কোম্পানি আরেকটি কোম্পানির উৎপাদন ক্ষেত্র ব্যবহার করতে পারছে। এতে উভয় কোম্পানিরই টিকে থাকার এবং মুনাফা করার সক্ষমতা বাড়ছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের রফতানি গন্তব্যের ব্যাপ্তি বেড়েছে এতে। রফতানির ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবহারের করতে পারার সক্ষমতা উন্নয়ন করতে পারলেই একটি কোম্পানির জন্য ব্যাপক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

বিদ্যমান ওষুধ নীতিটি শিল্পবান্ধব জানিয়ে মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, এ নীতিমালার কারণে বাংলাদেশের রফতানি সম্ভাবনা বেড়েছে ব্যাপক হারে। যদিও কোম্পানির সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করছে রফতানি করতে পারার বিষয়টি। কিন্তু ওষুধ নীতিমালা রফতানি সক্ষমতা গড়ে তোলার এবং বৃদ্ধির সুযোগ করে দিয়েছে। এ নীতির প্রভাবে ওষুধ আমদানির নিয়ন্ত্রিত বাজারগুলো ওষুধ উৎপাদনের জন্য ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও ভাবতে শুরু করেছে। আমদানিকারকদের আস্থা অনেক বেড়ে গেছে। কারণ উপমহাদেশে ভারতের পর এত বড় ফরমুলেশন ম্যানুফ্যাকচারিং বেজ আছে শুধু বাংলাদেশের। এখন আমদানিকারক দেশগুলোর সব শর্ত পরিপালন করতে পারলেই যেকোনো প্রতিষ্ঠান পণ্য রফতানির সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে। নীতির কারণে স্থানীয় ও রফতানি দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ওপর আস্থা অনেক বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। গত মার্চে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং চুক্তি হয় রেনাটা অনকোলজি লিমিটেড এবং অ্যাপেক্স ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের। শুধু স্কয়ার নয়, বাংলাদেশের প্রায় ২০০টি ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই এখন কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ওষুধ উৎপাদন করছে।

ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধিরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সবার সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন ফ্যাসিলিটি নেই। কোনো একটি ওষুধ পণ্যের চাহিদা যদি অনেক বেশি থাকলেও সে অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হতো না। কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সুবিধা থাকায় এখন একাধিক কারখানায় ওষুধ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে কঠোরভাবে সার্বিক কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করতে হয়। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং বৈশ্বিকভাবেই বহুল ব্যবহূত জানিয়ে ওষুধ উৎপাদনকারীরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন এ ব্যবস্থার সুফল নিতে পারছে। উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও এ ব্যবস্থা খুব কার্যকর ভূমিকা রাখছে। একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের আকারের কারণে অনেক সময় উৎপাদন খরচ কম বা বেশি হতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যয় বেশি হলে তা অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে তুলনামূলক কম ব্যয়ে উৎপাদন করিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে। উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার সুফল হিসেবে কম দামে ওষুধ বাজার থেকে কিনতে পারছেন ওষুধ ব্যবহারকারীরা।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী বলেন, জাতীয় ওষুধ নীতিমালার ফলে উৎপাদনে একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে ওষুধ শিল্পে। কোনো একটি কারখানায় বিশেষ কোনো ওষুধ উৎপাদন সক্ষমতা আছে কিন্তু পণ্যটি উৎপাদনের পরও উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেক অব্যহূত থেকে যায়, এমন ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে অন্য কোম্পানি আমাদের প্রতিষ্ঠানে ওই ওষুধটি উৎপাদন করতে পারে। সার্বিকভাবে কন্ট্রাক্ট এবং টোল ম্যানুফ্যাকচারিং অনুমোদনটা সব প্রতিষ্ঠানকে লাভবান হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নীতিমালার আগে একটি ওষুধ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহূত পড়ে থাকত। সেই সক্ষমতা ওষুধ উৎপাদনকারী অন্য প্রতিষ্ঠানও ব্যবহার করতে পারত না। নীতিমালার মাধ্যমে অব্যবহূত উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ওষুধপণ্য উৎপাদনে একাধিপত্যের সুযোগ কমে গেছে। সহযোগিতাপূর্ণ ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে প্রতিযোগী না বরং একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে।

দেশে ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানির ওষুধের বিক্রি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্লিনিক্যাল গবেষণার বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএ জরিপ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের ওষুধের বাজারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে ওষুধের বাজারের আকার ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। স্থানীয় বাজারে চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণের পর বিশ্বের ১২৭টি দেশে ওষুধ রফতানি করছে বাংলাদেশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১৩ কোটি ডলারেরও বেশি ওষুধ রফতানি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares