শিশুর ক্যান্সার ও কাউনসেলিং

সকালের ডাক ডেস্ক

ক্যানসার চিকিৎসার জন্য যে ব্যাপারটি খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো কাউনসেলিং। কাউনসেলিং কী? সহজভাবে ক্যানসারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাউনসেলিং হলো—রোগী, রোগীর মা-বাবা কিংবা অভিভাবককে রোগটা কী? এই রোগের কী কী চিকিৎসা আছে, চিকিৎসার ফলাফল কী হতে পারে, চিকিৎসার সময় এবং পরবর্তী সময়ে কী হতে পারে ইত্যাদি বিষয়ে সহজভাবে আলোচনার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া।

শিশু ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণত মা-বাবা কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবককে কাউনসেলিং করতে হয়। কাউনসেলিং করার জন্য প্রথম যে জিনিসটা প্রয়োজন সেটা হলো, শিশুর কী ধরনের ক্যানসার হয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা। তারপর সেই ক্যানসার কী পর্যায়ে আছে তা জানা। ক্যানসার একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আছে, না দেহের অন্য স্থানে ছড়িয়ে গেছে তা জানা। কারণ, এগুলোর ওপর চিকিৎসার ধরন এবং এর ফলাফল নির্ভর করে।
ক্যানসার চিকিৎসার উদ্দেশ্য হলো দুটো। একটা হলো আরোগ্যদায়ক চিকিৎসা করা, অন্যটা হলো প্রশমন চিকিৎসা করা। প্রথমে রোগের অবস্থা নির্ণয় করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে রোগটা কোন ধরনের এবং কোন পর্যায়ে আছে। এই রোগীকে নিরাময় চিকিৎসা দেওয়া উচিত কি না।
যদি দেখা যায় রোগ এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে একে নিরাময় করা সম্ভব নয়, তখন তাকে শুধু প্রশমন চিকিৎসা দেওয়ার কথা ভাবতে হয়।
এসব বিষয়ই রোগীর মা-বাবা কিংবা দায়িত্বশীল অভিভাবকের সঙ্গে আলাপ করতে হয়। নয়তো তাঁরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ভুল তথ্য নিতে শুরু করেন এবং শেষে ঠিকমতো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে দেখা যায়, যে রোগীকে নিরাময় চিকিৎসা দিলে ভালো হতো, সে কোনো চিকিৎসা না নিয়ে বসে থাকে এবং একসময় রোগী চিকিৎসার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়।
আবার যে রোগীর ভালো হওয়ার তেমন আশা নেই, সেই রোগীকে নিয়ে অযথা দৌড়াদৌড়ি করেন এবং শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো ফল হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে একটা শিশুর কাউনসেলিংয়ের জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে একের পর এক বেশ কয়েকজন আসেন। ফলে সেটা যেমন চিকিৎসকের জন্য সমস্যা হয়, তেমনি একই রোগীর ব্যাপারে কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়। ফলে চিকিৎসকের জন্য সিদ্ধান্ত দেওয়া বেশ ঝামেলা হয়। তা ছাড়া একই রোগীর ব্যাপারে বিভিন্নজনের সঙ্গে একই ব্যাপার বারবার আলাপ করে সময় ব্যয় করার ফলে অন্য রোগীকে সময় দিতে সমস্যা হয়। তাই কাউনসেলিং করার আগে শিশুর মা-বাবা কিংবা যদি তাঁরা অপারগতা প্রকাশ করেন, তবে তাঁদের পরিবার কিংবা পরিচিতজনের মধ্য থেকে দায়িত্বশীল একজনের সঙ্গে কথা বলতে হবে, যিনি শিশুর চিকিৎসার পুরো সময়টা সংশ্লিষ্ট থাকবেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন।
কাউনসেলিং ঠিকমতো করে চিকিৎসা শুরু করলে দেখা যাবে, যে প্রশমন চিকিৎসা পাওয়ার যোগ্য সে সেই চিকিৎসা নেবে এবং তার জীবনের শেষ দিনগুলো মোটামুটি স্বস্তিদায়ক যাবে। মা-বাবা হয়তো শেষ পর্যন্ত এই হতাশায় ভুগবেন না যে আমার বাচ্চাও হারালাম আর আমার শেষ সম্বল হারিয়ে পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করে দিলাম।
আবার অন্য দিকে নিরাময় চিকিৎসা পাওয়ার যোগ্য শিশু উপযুক্ত চিকিৎসা নিয়ে নিরাময় লাভ করবে।
শেষে উল্লেখ করব একজন শিশু ক্যানসার রোগীর কথা, যে গত এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। কেমোথেরাপি নিয়েও এর মধ্যে সে পরীক্ষা দিচ্ছিল। অনেক কষ্ট করেও সে লেখাপড়া আর চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। রেজাল্ট বের হওয়ার পর এসে বলছিল, ‘আমার ইচ্ছা আমি ডাক্তার হব এবং ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করব।’

মমতাজ বেগম
সহকারী অধ্যাপক, শিশু ক্যানসার বিভাগ,
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares