যে যে কারণে নামায ফাসেদ হয়

দৈনিক সকালের ডাক

[লোকমা দেওয়ার মাসআলা]

ভুল কেরাআত পাঠকের ভুল সংশোধন করিয়া দেওয়াকে ‘লোকমা দেওয়া’ বলে।

১।মাসআলাঃ নামাযের মধ্যে নিজের ইমাম ব্যতীত অন্য কাহাকেও লোকমা দিলে নামায বাতিল হইয়া যায়।

২।মাসআলাঃ ছহীহ ক্বওল এই যে, ইমামকে লোকমা দিলে নামায বাতিল হইবে না; ইমাম যদি যরূরত পরিমাণ কেরাআত পড়ার আগেই আটকিয়া যায় এবং সেই অবস্থায় লোকমা দেয়, তবে ত নামায বাতিল হইবে না; এমনকি যদি যরূরত পরিমাণ কেরাআত পড়ার পরও লোকমা দেয়, তবুও নামায বাতিল হইবে না। অর্থাৎ, যেই নামাযে যেই পরিমাণ কেরাআত পড়া সুন্নত সেই পরিমাণ কেরাআত পড়া।

৩।মাসআলাঃ ইমাম যদি যরূরত পরিমাণ কেরাআত পড়িবার পর আটকিয়া যায় তবে তাহার তৎক্ষণাৎ রুকূতে যাওয়া উচিত, (বার বার দোহরাইয়া বা ভুল বাদ দিয়া পড়িয়া বা চুপ করিয়া থাকিয়া) মুক্তাদীকে লোকমা দেওয়ার জন্য মজবুর করা উচিত নহে, এইরূপ করা মকরূহঃ এখানে যরূরতের অর্থ হইল, ইমাম যদি যরূরত পরিমাণ কেরাআত পড়িনে না পারে, আটকিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকে বা বার বার দোহরাইতে থাকে বা ভুল রাখিয়া সামনে পড়া শুরু করে, তবে মুক্তাদী লোকমা দিবে। অবশ্য যদি এইরূপ যরূরত ছাড়াও নিজের ইমামকে লোকমা দেয়, তবে তাহাতে নামায বাতিল হইবে না; মকরূহ হইবে।

৪।মাসআলাঃ একজন লোক নামায পড়িতেছে, তাহাকে তাহার মুক্তাদী ছাড়া অন্য কেহ লোকমা দিল, যদি সে ঐ লোকমা লয়, তবে তাহার নামায বাতিল হইয়া যাইবে, অবশ্য যদি তাহার নিজেরই স্মরণ হইয়া থাকে, (লোকমার সঙ্গে সঙ্গে বা আগে বা পরে) এবং নিজের স্মরণ অনুসারে পড়ে, তবে তাহার নামায ফাসেদ হইবে না।

৫।মাসআলাঃ যদি কোন ব্যক্তি নামাযের মধ্যে থাকিয়া নিজের ইমাম ছাড়া অন্য কাহাকে লোকমা দেয়, তবে তাহার নামায ফাসেদ হইয়া যাইবে। অন্য ব্যক্তি নামাযের মধ্যে হউক বা না হউক।

৬।মাসআলাঃ যদি মুক্তাদী অন্যের পড়া শুনিয়া কিংবা কোরআন মজীদ দেখিয়া ইমামকে লোকমা দেয়, তবে তাহার নামায ফাসেদ হইয়া যাইবে, যদি ইমাম লোকমা লয়, তাঁহারও নামায ফাসেদ হইয়া যাইবে। আর যদি কোরআন মজীদ দেখিয়া বা অন্যের পড়া শুনিয়া মুক্তাদীর স্মরণ হয় এবং নিজের স্মরণেই লোকমা দেয়, তবে নামায ফাসেদ হইবে না।

৭।মাসআলাঃ এইরূপে যদি নামাযে কোরআন মজীদ দেখিয়া একটি আয়াত পড়ে, তবুও নামায ফাসেদ হইবে। কিন্তু যে আয়াত দেখিয়া পড়িয়াছে, তাহা যদি প্রথম হইতে ইয়াদ থাকিয়া থাকে, তবে নামায ফাসেদ হইবে না কিংবা প্রথম হইতে স্মরণ তো ছিল না কিন্তু এক আয়াতের কম দেখিয়া পড়িয়া থাকে, তবে নামায ফাসেদ হইবে না।

৮।মাসআলাঃ মেয়েলোক যদি পুরুষের সঙ্গে এইরূপে দাঁড়ায় যে, একজনের কোন অঙ্গ অপর জনের কোন অঙ্গের বরাবর হইয়া যায়, তবে নিম্ন শর্তে নামায ফাসেদ হইয়া যাইবে। এমন কি, যদি সজদায় যাওয়ার সময় মেয়েলোকের মাথা পুরুষের পা বরাবর হইয়া যায় তবুও নামায ফাসেদ হইবে।

১ম শর্তঃ মেয়েলোক বালেগা হওয়া চাই (যুবতী হউক বা বৃদ্ধা হউক) কিংবা সহবাস উপযোগী নাবালেগা হউক। আর যদি অল্প বয়স্কা নাবালেগা মেয়ে নামাযে বরাবর হইয়া যায়, তবে নামায ফাসেদ হইবে না।

২য় শর্তঃ উভয়েই নামাযে হওয়া চাই। যদি একজন নামাযে অন্যজন নামাযের বাহিরে থাকে, তবে এরূপ বরাবর হওয়ায় নামায ফাসেদ হইবে না।

৩য় শর্তঃ উভয়ের মাঝে কোন আড়াল না হওয়া। যদি মাঝখানে কোন পর্দা থাকে কিংবা কোন সুতরা থাকে, অথচ মাঝখানে এত পরিমাণ জায়গা খালি থাকে যে, অনায়াসে একটি লোক দাঁড়াইতে পারে, তবে নামায ফাসেদ হইবে না।

৪র্থ শর্তঃ নামায ছহীহ হওয়ার শর্তাবলী ঐ মেয়েলোকের মধ্যে থাকা চাই। কাজেই মেয়েলোক যদি পাগল অথবা ঋতুমতী বা নেফাস অবস্থায় হয়, তবে ঐ মেয়েলোকের বরাবরী হইলে নামায ফাসেদ হইবে না। কেননা, এসব অবস্থায় এই মেয়েলোক নামাযের মধ্যে গণ্য নহে।

৫ম শর্তঃ জানাযার নামায না হওয়া চাই। জানাযার নামাযে বরাবর হইলে নামায ফাসেদ হইবে না।

৬ষ্ঠ শর্তঃ বরাবরী এক রোকন পরিমাণ। (অর্থাৎ তিন তসবীহ পড়ার সময় পরিমাণ) স্থায়ী হওয়া চাই। যদি ইহার কম সময় বরাবর থাকে, তবে ফাসেদ হইবে না। যেমন, এতটুকু সময় বরাবর রহিয়াছে, ঐ পরিমাণ সময়ে রুকূ সজদা ইত্যাদি হইতে পারে না। এই অল্প সময়ের বরাবরীতে নামায ফাসেদ হয় না।

৭ম শর্তঃ উভয়ের তাহরীমা এক হওয়া চাই। অর্থাৎ এই মেয়েলোক ঐ পুরুষের মুক্তাদী হওয়া, কিংবা উভয়ে কোন তৃতীয় ব্যক্তির মুক্তাদী হওয়া।

৮ম শর্তঃ ইমামের নামাযের প্রথমে বা মাঝখানে যখন মেয়েলোক শামিল হইয়াছে তাহার ইমামতের নিয়ত করা চাই। ইমাম যদি ইমামতের নিয়ত না করে, তবে এই বরাবরীতে নামায ফাসেদ হইবে না; বরং ঐ মেয়েলোকের নামায ছহীহ হইবে না।

৯।মাসআলাঃ কোন স্ত্রীলোক পুরুষের কাতারে দাড়াইয়া জমাআতে নামায পড়িলে পার্শ্ববর্তী পুরুষদের নামায ফাসেদ হইয়া যাইবে।

১০।মাসআলাঃ ইমামের ওযূ টুটিয়া গেলে ইমাম যদি কোন উপযুক্ত লোককে খলীফা না বানাইয়া মসজিদ হইতে বাহির হইয়া যায়, তবে মুক্তাদীদের নামায ফাসেদ হইয়া যাইবে।

১১।মাসআলাঃ ইমাম যদি কোন পাগল, নাবালেগ মা মেয়েলোককে-যে ইমামের অযোগ্য এরুপ খলীফা বানায়, তবে সকলের নামায ফাসেদ হইয়া যাইবে।

১২।মাসআলাঃ স্বামী নামায পড়িবার সময় যদি স্ত্রী তাহাকে চুম্বন করে (এবং স্বামীর মনে কোন চাঞ্চল্য না জন্মে) তবে তাহার নামায নষ্ট হইবে না, কিন্তু মনে চাঞ্চল্য জন্মিলে নামায নষ্ট হইয়া যাইবে। যদি মেয়েলোক নামায পড়িবার সময় পুরুষ তাহাকে চুম্বন করে তবে, তবে মেয়েলোকের নামায ফাসেদ হইবে। কামভাবে চুম্বন করা কিংবা বিনা কামভাবে। মেয়েলোকের মধ্যে কামভাব উদয় হউক কিংবা না হউক।

১৩।মাসআলাঃ নামাযীর সামনে দিয়া যদি কেহ যাইতে চায়, তবে তাহাকে বাধা দেওয়া যায়েয আছে, কিন্তু যদি নামাযের মধ্যে থাকিয়া বাধা দিতে গিয়া ‘আমলে কাছীর করিতে (অর্থাৎ, কথা বলিতে হয়, বা হাটিয়া অগ্রসর হইতে হয়, বা ধাক্কাধাক্কী করিতে) হয়, তবে নামায বাতিল হইয়া যাইবে, কিন্তু যদি আস্তে হাত দিয়া ইশারা করিয়া দেয়, বা সোবহানাল্লাহ বলিয়া সতর্ক করিয়া দেয়, তবে তাহাতে নামায নস্ট হইবে না।–বেহেশতী গওহর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares