বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাই মিতব্যয়ী হবেন: প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক

সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক ভর্তুকি দিচ্ছে, তাই দেশের জনগণকে মিতব্যয়ী হয়ে ব্যবহার করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, গ্রাহকদের অনুরোধ করব, আপনারা বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই মিতব্যয়ী হবেন, সাশ্রয়ী হবেন। অহেতুক বিদ্যুৎ অপচয় আপনারা করবেন না। এতে আপনাদেরই লাভ যে বিদ্যুতের বিলটা কম উঠবে। অন্তত নিজেদের কথা চিন্তা করে বিদ্যুৎ বিল যাতে কম হয় সেদিকে লক্ষ রেখে ব্যবহার করবেন; অপচয়টা বন্ধ করবেন—এটা আমার বিশেষ অনুরোধ।

গতকাল সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ১১টি গ্রিড উপকেন্দ্র ও ছয়টি সঞ্চালন লাইন এবং ৩১টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কিন্তু অনেক বেশি হয়। এলএনজি আমদানি করছি। এত বেশি খরচের জায়গায় আমরা কিন্তু এখনো ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছি। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ যেটা হয় তার চেয়ে কম পয়সায় আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ করছি। অনেক বেশি ভর্তুকি আমাদের দিতে হচ্ছে। কিন্তু ভর্তুকি সব সময় দেয়া সম্ভব নয়। এটাও সবাইকে মাথায় রাখতে হবে। যেহেতু আমরা উন্নয়নের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করছি, মানুষের অসুবিধাগুলো দূর করতে চাচ্ছি।

মুজিব বর্ষের মধ্যে শতভাগ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে আশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এরই মধ্যে দেশের শতকরা ৯৭ দশমিক ৫ ভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি এবং আশা করছি ২০২১ সাল নাগাদ আমরা দেশের সব মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পারব। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ২০২১ সাল নাগাদ ২৪ হাজার মেগাওয়াট, ২০৩০ সাল নাগাদ ৪০ হাজার মেগাওয়াট ও ২০৪১ সাল নাগাদ ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, আমরা সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছি। এগুলোতে যাতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান হয় তার জন্য আমাদের বিদ্যুৎ দরকার। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। এই ডিজিটাল বাংলাদেশের ব্যবহার যত বেশি বাড়বে, বিদ্যুতের চাহিদাও তত বেশি বাড়বে। সেদিকে লক্ষ রেখে এবং সার্বিকভাবে যাতে অর্থনৈতিক উন্নতি হয় অর্থাৎ উন্নতিটা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না, শহরকেন্দ্রিক না, আমরা প্রতিটা গ্রামকে শহরে রূপান্তর করতে চাই। এ সময় তিনি নাগরিক সুবিধা গ্রামের মানুষের ঘরে পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

স্বাধীনতার পর জাতির পিতার নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, শুধু একটা প্রত্যয় নিয়ে, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, যে লক্ষ্য নিয়ে জাতির পিতা স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তার সেই স্বপ্ন পূরণ করা, বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, বাংলার মানুষকে একটি সুন্দর জীবন উপহার দেয়া এবং স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ছয়টি বছর আমাদের বিদেশে রিফিউজি হিসেবে থাকতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগ যখন আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করে তখন ফিরে আসার সুযোগ পাই। তখন জোর করে দেশে ফিরে আসি। তার পর থেকেই এই প্রচেষ্টা, যে স্বপ্ন আমার বাবা দেখে গেছেন।

তিনি বলেন, সার্বিক উন্নয়নের জন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন হয় রাস্তাঘাট বা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। এছাড়া আরেক দিক হলো বিদ্যুতের ব্যবস্থা। যদি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যায়, স্বাভাবিকভাবে সেসব এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হতে পারে। শুধু ঘরে আলো জ্বেলে ঘরে বসে থাকা নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা শিল্প গড়ে তোলা অথবা কৃষি খামার গড়ে তোলা বা যেকোনো কাজের জন্য বিদ্যুৎ একান্ত অপরিহার্য। সেজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চালন বৃদ্ধি ও মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছে। তার শুভ ফল আজ মানুষ পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্য হলো যে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতে বাজেট দেয়ার সময় খুব গালভরা কথা বলত, গোপালগঞ্জের জন্য এটা দেব, ওটা দেব। আর বাজেট দেয়া শেষ হয়ে গেলে টাকাগুলো কেটে নিয়ে চলে যেত। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় নিজের এলাকা টুঙ্গিপাড়ায় গেলে কেমন অভিজ্ঞতা হতো, সে কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হয়তো সারা দিনেও বিদ্যুৎ পেতাম কিনা সন্দেহ, পেতাম না। জেনারেটর দিয়ে চালাতে হতো বা হারিকেন জ্বালাতে হতো। কিন্তু আমরা যখন উন্নয়ন করি, তখন কিন্তু আমরা এ রকম নির্দিষ্ট কোনো জায়গাকে অবহেলা করি না। কাজেই আজকে সেটার একটা দৃষ্টান্ত পাচ্ছেন যে বগুড়া জেলায় ১১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আমরাই প্রতিষ্ঠা করেছি এবং আমরা আজকে তা উদ্বোধন করছি।

গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এ সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ তার মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় থেকে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. সুলতান আহমেদ ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত: বঙ্গবন্ধু থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা’ শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন।

নতুন করে যেসব উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে সেগুলো হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর, সরাইল ও আশুগঞ্জ, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ ও কচুয়া, কুমিল্লা জেলার বরুড়া ও মুরাদনগর, ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা ও বোয়ালমারী, গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর, ঝিনাইদহ জেলার ঝিনাইদহ সদর, মানিকগঞ্জ জেলার মানিকগঞ্জ সদর, দৌলতপুর, সিংগাইর ও শিবালয়, মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর, মান্দা ও ধামইরহাট, নওগাঁ জেলার সাপাহার, নীলফামারী জেলার ডোমার, নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ, পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ, রাজবাড়ী জেলার রাজবাড়ী সদর, পাংশা ও বালিয়াকান্দি, রাজশাহী জেলার বাগমারা, সাতক্ষীরা জেলার সাতক্ষীরা সদর, সিলেট জেলার জকিগঞ্জ ও ওসমানী নগর, নরসিংদী জেলার রায়পুরা এবং মাদারীপুরের কালকিনী। নতুন ৩১টি উপজেলাসহ মোট ২৮৮টি উপজেলা শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করা বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি হলো কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া-১ লিমিটেডের ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নোয়াখালীর এইচএফ পাওয়ার লিমিটেডের ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মহাস্থানগড় ১৩২/৩৩ কেভি, রাজশাহী (উত্তর) ১৩২/৩৩ কেভি, চৌদ্দগ্রাম ১৩২/৩৩ কেভি, ভালুকা ১৩২/৩৩ কেভি, বেনাপোল ১৩২/৩৩ কেভি ও শরীয়তপুর ১৩২/৩৩ কেভি সাবস্টেশন উদ্বোধন করেন।

এছাড়া, তিনি ৪০০/২৩০/১৩ কেভি গ্রিড নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় শ্যামপুর ২৩০/১৩২ কেভি সাবস্টেশন, পল্লী বিদ্যুতায়ন প্রকল্পের আওতায় গ্রিড সাবস্টেশন এবং সঞ্চালন জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় শেরপুর ১৩২/৩ কেভি ও কুড়িগ্রাম ১৩২/৩৩ কেভি, পল্লী বিদ্যুতায়ন প্রকল্পের আওতায় নড়াইল ১৩২/৩৩ কেভি এবং রাজেন্দ্রপুর ১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস (গ্যাস ইন্সুলেটেড সুইসগিয়ার) প্রকল্পের আওতায় রাজেন্দ্রপুর ১৩২/৩৩ সাবস্টেশন নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করা ছয়টি সঞ্চালন লাইনের মধ্যে রয়েছে পটুয়াখালী (পায়রা)-গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন, যশোর-বেনাপোল ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন, শরীয়তপুর-মাদারীপুর ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন, তিস্তা-কুড়িগ্রাম ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন, মাগুরা-নড়াইল ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং পটুয়াখালী-পায়রা ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares