বাগলী স্থল বন্দরের চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ


সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলাস্থ বাগলী চুনাপাথর ও কয়লা আমদানীকারক সমিতি নামীয় অনিবন্ধিত সমিতির চাদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়। গতকাল ২রা নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ আইন-২ শাখার উপসচিব ফৌজিয়া খান স্বাক্ষরিত এক আদেশে পুলিশ মহাপরিদর্শক বরাবর এ নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

উল্লেখ্য, বাগলী চুনাপাথর ও কয়লা আমদানীকারক সমিতির নামে চাদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য গত ২৬শে নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন মেসার্স দিলারা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধীকারী ও ১নং শ্রীপুর(উত্তর) ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের প্রাক্তন সভাপতি মোঃ আতিকুর রহমান।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বাগলী চুনাপাথর ও কয়লা আমদানীকারক সমিতি নামীয় ভোয়া সাইনবোর্ড ব্যাবহার করে দীর্ঘদিন ধরেই বেপরোয়া চাদাবাজি করছে একটি চক্র। এই শুল্ক ষ্টেশনটির চাদাবাজির কারনে দিনে দিনে কমছে আমদানীকারকের সংখ্যা, কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এদেও চাদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে এ পর্যন্ত অনেক ব্যাবসায়ীরাই এ স্থল বন্দর ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছেন তামাবিল, সুতারকান্দি, হালুয়াঘাটসহ ভুড়িমাড়ি স্থল বন্দরে। যার দরুন একদিকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, অপরদিকে চাঁদাবাজির টাকা থেকে অর্জিত অর্থে রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সমিতির সভাপতি খালেক মোশারফ, সাধারন সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, অর্থ সম্পাদক বিজিবি সোর্স আলী হোসেনসহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুল হায়দার লিটন। এ চাঁদাবাজি বন্ধ না করা গেলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ স্থলবন্দরটি দিয়ে যেকোনো সময়ে আমদানি কার্যক্রম বন্ধের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

অভিযোগে আরো বলা হয়, আমরা ব্যবসায়ীরা প্রতিটি এলসিতে সরকার বাহাদুর নির্ধারিত কর পরিশোধ করে ভারত থেকে কয়লা চুনাপাথর আমদানি করে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করি। কিন্তু বাগলি চুনাপাথর আমদানি কারক সমিতি নামীয় অবৈধ সমিতির চাঁদাবাজির কারনে হুমকির মুখে পড়েছে আমাদের ব্যবসা। আমাদের আমদানিকৃত চুনাপাথর বাংলাদেশে যখন আসে তখন প্রতিটি ট্রাকে এই সমিতিকে ৮০ টাকা করে চাদা দিতে হয়। আবার আমরা যখন আমাদের আমদানিকৃত কয়লা ও চুনাপাথর বিক্রি করতে যাই তখন প্রতি বিশ মে.টন চুনাপাথরে ৫০০টাকা চাদা দিয়ে সমিতির স্লিপ নিতে হয় কিন্তু সমিতি’র স্লিপে উল্লেখ করা হয় ৫০ টাকা। এই চাঁদা আদায়ের রশিদগুলোর কোনটাতেই বহি নম্বর দেয়া থাকে না। ৫০ টাকার স্লিপ দিয়ে ৫০০ টাকা কেনো রাখা হচ্ছে এই প্রশ্ন জানতে চাইলেই তাদের পালিত সেন্ট্রি নামীয় লাঠিয়াল বাহিনীর দ্বারা নৌকা আটক করে রাখা হয়।

এছাড়াও নতুন ব্যাবসায়ীদের সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত করার সময়ে সমিতির নামে ২০ হাজার টাকার রশিদ দিলেও ম‚লত প্রতি সদস্য থেকে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। বিগত ৫ বছরে কয়লা আমদানিকারক সমিতির অধীন নদী পথে প্রতিদিন প্রায় ৩শ ষ্টিল বডির বাল্কহেড নৌকা ও কার্গো কয়লা, চুনা পাথর পরিবহন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। এসব কয়লা ও চুনা পাথরবাহী নৌকা থেকে আমদানিকারক সমিতির নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে এই চক্রটি। বাগলি চুনাপাথর আমদানিকারক সমিতির নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদা উত্তোলন করলেও কোনদিন সমিতি এলাকার রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন করেনি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, সমিতির সভাপতি খালেক মোশারফ তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন।

বিএনপির শাসনামলে তার ভয়ে সব সময়ই এলাকার আওয়ামীলীগ নেতারা আতঙ্কে থাকতেন। তিনি বিভিন্ন মেয়াদে একাধারে তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য, তাহিরপুর উপজেলা যুবদলের সহ-সভাপতি এবং ১নং শ্রীপুর(উত্তর) ইউনিয়ন যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দীর্ঘদিন দ্বায়িত্বে ছিলেন।
বিএনপির কয়েকটি সাংগঠিনক পদে বহাল থাকাবস্থায় বিএনপির কোন কমিটি থেকে পদত্যাগ না করেই ২০১৪ সালে তিনি তাহিরপুর  উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আবুল হোসেন খানের হাত ধরে আওয়ামীলীগের রাজণীতিতে প্রবেশ করেন। দলে প্রবেশ করার পর পরই তিনি সেই নেতার ঘনিষ্টজন হিসেবে এলাকায় পরিচিতি লাভ করেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে ১ বছরের মধ্যেই উপজেলা আওয়ামীলীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক হিসেবে পদায়ন হন।
উল্লেখ্য ২০১৬ সাল পর্যন্ত উপজেলা যুবদলের কমিটির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিএনপির উপরোল্লিখিত পদগুলোতেও বহাল ছিলেন । তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের কমিটিতে স্থান পাওয়ার পর পরই তিনি একাধারে বাগলী চুনাপাথর ও কয়লা আমদানীকারক সমিতির সভাপতি, বাগলি বাজার কমিটির সভাপতি,বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল বাজার কমিটির সভাপতি, বাগলি উচ্চ বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, বীরেন্দ্র নগর উত্তরপাড়া মসজিদ কমিটির সভাপতি পদে আসীন হন।
বাগলী বাজারস্থ আবুল হোসেন খানের ব্যাক্তিগত কার্যালয়কে আমদানীকারক সমিতির অফিস বানিয়ে শুরু হয় তাদের চাদাবাজির রাজত্ব। চাদাবাজীর অর্থে আয়েশী জীবন যাপনসহ বাগলী বাজারে গড়ে তুলেছেন ইরা প্লাজা নামীয় বহুতল ভবন, ময়মনসিংহ শহরের কোতোয়ালী মডেল থানার কাশর করোনেশন রোডে স্ত্রী অজিফা মোশারফের নামে গড়েছেন বিলাসবহুল বাড়ি যার নামকরন করা হয়েছে মিলি/ইরা ভাগলী নিবাস।

অপরদিকে সমিতির সাধারন সম্পাদক ডা. মনিরুজ্জামান মনির শিবির নেতা হিসেবেই এলাকাতে পরিচিত । বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে আতাত করে আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে সে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে।

আওয়ামীলেিগর ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ১নং ওয়ার্ডে তার বাড়ি হওয়ার সুবাদে সে  ভেঙ্গে দেয় আওয়ামীলীগের ভোট ব্যাংক এবং শুধুমাত্র এই কেন্দ্রে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ভোট কম পাওয়ায়  মাত্র ৩২৩ ভোটে পরাজিত হয় নৌকা প্রতীক মনোনীত প্রার্থী। সেই মনিরুজ্জামান মনির বর্তমানে ১নং শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক। অপরদিকে সমিতির অর্থ সম্পাদক বিজিবি সোর্স আলী হোসেনের ছোট ভাই কামাল মিয়া ১নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হিসেবে দ্বায়িত্বে রয়েছে। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকার সুফল দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা ভোগ করতে না পরলেও খালেক মোশারফ, মনিরুজ্জামান মনির ও আলী হোসেনের মতো সুবিধাবাদীরা ঠিকই ভোগ করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে আরো জানা যায়, খালেক মোশারফ এলাকার চিহ্নিত একজন মাদক ব্যবসায়ী।বিভিন্ন লোকজনকে দিয়ে সে পরিচালিত করে আসছে তার মাদকের সা¤্রাজ্য।তার চোরাই পথে আনীত মাদকের নেশায় ধ্বংস হচ্ছে সীমান্ত এলাকার যুব সমাজ। বিগত ০৩/০৮/২০২১ইং তারিখে সুনামগঞ্জ ২৮বিজিবির অধীনস্থ আশাউরা সীমান্ত ফাড়ির নায়েক সুবেদার মোঃ নাইমুল হক সুনামগঞ্জ সদর থানায় The special power act, 1974 section 25B/25D ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন, মামলা নং-০১/২১৭ এবং ডলুরা বিওপির হাবিলদার মোঃ নবীর হোসেন বিশ্বম্ভরপুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইন, ২০১৮ সনের ৩৬(১) এর সারনী ১০(ক) ধারায় অপর একটি মামলা দায়ের করেন, মামলা নং-৮/৮৬, তারিখ ২৯/০৭/২০২১ইং।

অভিযোগের বিষয়ে বাগলী চুনাপাথর ও কয়লা আমদানীকারক সমিতির সভাপতি খালেক মোশারফের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি ২০১৪ সালে আওয়ামীলীগে যোগদান করার সময় যুবদলের উপজেলা সহ-সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ না করলেও আমার জানামতে উপজেলা কমিটির নেতৃবৃন্দ আমাকে বহিস্কার করেছিলেন।

কিন্তু এখন আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম তারা আমাকে বহিস্কার করেননি, ২০১৬ সাল পর্যন্ত আমি ওই পদে বহাল ছিলাম। সমিতির নামীয় ৫০ টাকার স্লিপ দিয়ে ৫০০ টাকা কেনো রাখা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে সমিতি তৈরির পর থেকেই এভাবে চলে আসছে তাই আমিও এভাবেই চালাচ্ছি।
কেএ/টি ইস/জু আ/আতিকুর রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares