বাংলাদেশীদের জন্য বন্ধ শেনজেন ভিসা সুবিধা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কভিড-১৯ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশীদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।এছাড়া চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রবেশ করতে পারেন না বাংলাদেশীরা।এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৬টি দেশও পুনরায় চালু হতে যাওয়া শেনজেন ভিসা সুবিধার বাইরে রাখছে বাংলাদেশকে। ফলে আরো বিলম্বিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশী নাগরিকদের শেনজেন দেশে ভ্রমণ।

কভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে গত মার্চ থেকে নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করে দেয় শেনজেন কান্ট্রিজ  হিসেবে পরিচিত ইইউর ২৬টি দেশ। সাময়িক বন্ধ রাখা হয় শেনজেন ভিসাও। সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আগামী ১ জুলাই সীমান্ত খুলে দিচ্ছে দেশগুলো। পাশাপাশি ইইউর সদস্য ছাড়াও আরো ৫৪টি দেশের নাগরিকদের জন্য বৈধ করা হচ্ছে শেনজেন ভিসা। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি অবনতির দিকে থাকায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশকে আপাতত শেনজেন ভিসা সুবিধার বাইরে রাখা হয়েছে।

গতকাল ইইউর বরাত দিয়ে গালফ নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় ইউরোপিয়ান কমিশন ১৫ জুন থেকে ইইউ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সীমান্ত খুলে দেয়ার সুপারিশ করে।কমিশন একই সঙ্গে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তৃতীয় দেশগুলোর জন্য ধীরে ধীরে ভিসা সুবিধা উন্মুক্ত করে দেয়ার পরামর্শ দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে করোনা পরিস্থিতি ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে এমন দেশগুলোর জন্য ইইউর সীমান্ত খুলে দেয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে দেশগুলো। এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কসোভো, উত্তর মেসিডোনিয়া, মন্টেনেগ্রোসহ ৫৪টি তৃতীয় দেশের জন্য শেনজেন ভিসা উন্মুক্ত করার তালিকা করা হয়েছে। এসব দেশের নাগরিকরা আগামী ১ জুলাই থেকে ইইউভুক্ত ২৬টি দেশে শেনজেন ভিসা সুবিধা পাবেন। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্য কেবল ভারত ও ভুটানের নাগরিকরা আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে শেনজেন ভিসা সুবিধার আওতায় ইইউভুক্ত দেশগুলোতে অবাধ চলাচল করতে পারবেন। করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাংলাদেশের মতো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রাজিল, কাতারসহ বহু দেশকে শেনজেন ভিসা সুবিধার বাইরে রেখেছে ইইউ।

রফতানিককারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) সভাপতি ও সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী এ প্রসঙ্গে বলেন, শেনজেন ভিসা সুবিধার আওতায় না থাকা বাংলাদেশী  ব্যবসায়ীদের জন্য খুবই খারাপ খবর। সরকারের যেসব উদ্যোগ রয়েছে তাতে শিগগিরই করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলে আশা করা যায়। পরিস্থিতি উন্নতি হলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাগুলোও ধীরে ধীরে উঠে যাবে।

উল্লেখ্য, শেনজেন হচ্ছে ইইউর পাসপোর্ট ফ্রি জোন। এই শেনজেন জোনে কোনো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নেই। ইইউর ২৬টি দেশের যেকোনো নাগরিকই শেনজেনভুক্ত এলাকায় সফর করতে পারেন। শেনজেনভুক্ত দেশগুলো হলো অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, ইতালি, লাটভিয়া, লিচেনস্টেইন, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড।

কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশীদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ফ্লাইট চালু করেছে কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটস এয়ারলাইনস। তবে কেবল ট্রানজিট যাত্রীই পরিবহন করছে এয়ারলাইনস দুটি। কারণ নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকায় বাংলাদেশীদের প্রবেশাধিকার নেই কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রবেশ করতে পারেন না বাংলাদেশীরা।

গত এপ্রিলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের জাপানে ফেরাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ ভাড়া করে তিন চারটি চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। ওইসব ফ্লাইটে যাওয়া যাত্রীদের বাংলাদেশে পরীক্ষা চালিয়ে করোনার নেগেটিভ রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু জাপান যাওয়ার পর পরীক্ষা করলে তাদের মধ্যে চারজনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে মে মাসের প্রথমদিকে শর্ত আরোপ করে দেশটি। এ কারণে বাংলাদেশী কোনো নাগরিক এখন জাপানে যেতে পারছেন না।

তবে বিশেষ কোনো কারণে বাংলাদেশ থেকে জাপানগামী ফ্লাইট স্থগিত করা হয়নি উল্লেখ করে ১৯ জুন বিবৃতি দেয়ে জাপান দূতাবাস। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত-পাকিস্তান থেকেও যাত্রীদের বহন বন্ধ আছে। ২৭ মে এই নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। এ অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে।’

একই ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়াগামী চার্টার্ড ফ্লাইটের আরোহী যাত্রীদের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশে পরীক্ষা চালিয়ে এসব যাত্রীর সংক্রমণ শনাক্ত না হলেও দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া অন্তত ছয়জন বাংলাদেশী এবং একজন কোরীয় নাগরিকের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২১ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা মানুষের মাধ্যমে নতুন করে সে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ অনেক বেড়ে যাওয়ায় এই দুই দেশের নাগরিকদের কোরিয়ার ভিসা এবং প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে, যা এরই মধ্যে বাস্তবায়ন করেছে দেশটি। তবে কূটনৈতিক ও জরুরি ব্যবসায়িক কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এমন দেশগুলোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে। যেসব দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব দেশ থেকে নন-শিডিউলড ফ্লাইটও সাময়িক বন্ধ থাকবে।

এদিকে ১১ জুন ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংঝু শহরে যাওয়া চায়না সাউদার্নের একটি ফ্লাইটের ১৭ জন যাত্রীর নমুনা পরীক্ষায় করোনাভাইরাস পজিটিভ শনাক্ত হয়।ফলে চায়না সাউদার্নের ঢাকার ফ্লাইট চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছে চীনের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।নিষেধাজ্ঞার ফলে ২২ জুন থেকে চার সপ্তাহ চীনের এই উড়োজাহাজ সংস্থা ঢাকায় ফ্লাইট চালাতে পারছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares