তারাবীহ নামাযের কিছু মাসআলা

দৈনিক সকালের ডাক

১।মাসআলাঃ বেৎরের নামায তারবীহর পরে পড়া আফযল। যদি তারাবীহর আগে বেৎর পড়ে, তাহাও দুরুস্ত আছে।

২।মাসআলাঃ তারাবীহর প্রত্যেক চারি রাকা’আতের পর, চারি রাকা’আত পরিমাণ সময় বসিয়া বিশ্রাম করা মোস্তাহাব। কিন্তু যদি এত সময় বসিয়া থাকিলে জমা’আতের লোকের কষ্ট হয় বা জমা’আত কম হওয়ার আশংকা থাকে, তবে এত সময় বসিবে না, কম বসিবে। এই বিশ্রামের সময় শুধু চুপ করিয়া বসিয়া থাকা, পৃথক পৃথক নফল নামায পড়া বা তসবীহ, দুরূদ ইত্যাদি পড়া সব জায়েয আছে। এদেশে ‘সোবহানা যিল মুলকে ওয়াল মালাকূতে’ পড়ার এবং মোনাজাত করার যে প্রচলন আছে, তাহাও জায়েয আছে। কিন্তু এই দো’আ কোন ছহীহ হাদীসে নাই। আবার অনেকে এই দো’আ না জানার কারণে তারাবীহই পড়ে না তাহাদিগকে বুঝাইয়া দেওয়া দরকার যে, এই দো’আ না পড়িলে নামাযের কোন ক্ষতি হইবে না, নামায হইয়া যাইবে। যদি পারে, তবে শুধু [আরবি] (সোবহানাল্লাহ) [আরবি] (সোবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী সোবহানাল্লাহিল আ’যীম) পড়িবে। কিছু না পড়িয়া নীরবে বসিয়া থাকিলেও নামাযের কোন ক্ষতি নাই (প্রত্যেক চতুর্থ রাকা’আতে মোনাজাত করা জায়েয আছে, কিন্তু বিশ রাকা’আতের পর বেৎরের পূর্বে দো’আ করাই আফযল।

৩।মাসআলাঃ যদি কাহারও এশার নামায কোন কারণ বশতঃ ফাসেদ হইয়া যায় এবং তাহা বেৎর এবং তারাবীহ যত রাকা’আত পড়িয়াছে, তাহাও দোহরাইতে হইবে।

৪।মাসআলাঃ এশার নামায জমা’আতে না পড়িলে তারাবীহর নামাযও জমা’আতে পড়া জায়েয হইবে না। ইহার কারণ তারাবীহ এশার তাবে (অনুগামী), কাজেই এশার চেয়ে তারাবীহর সম্মান বেশী করা জায়েয নহে! অতএব, যদি কোথাও পাড়ার লোকেরা দুর্ভাগ্য বশতঃ এশার নামাযের জমা’আত না করিয়া শুধু তারাবীহর জমা’আত করিতে চায়, তবে তাহা জায়েয হইবে না। কিন্তু যদি পাড়ার লোকেরা এশার জমা’আত পড়িয়া তারাবীহর নামায জমা’আতে পড়িতে থাকে এবং দুই একজন লোকে এশার নামাযের জমা’আত না পাইয়া থাকে, তবে তাহারা এশার নামায একা একা পড়িয়া তারাবীহর জমা’আতে শরীক হইতে পারে, তাহাতে কোন বাধা নাই।

৫।মাসআলাঃ যদি কেহ মসজিদে আসিয়া দেখে, এশার জমা’আত হইয়া গিয়া তারাবীহ শুরু হইয়া গিয়াছে, তবে সে আগে একা একা এক পার্শ্বে এশা পড়িয়া লইবে, তারপর তারাবীহর জমা’আতে শামিল হইবে। ইত্যবসরে যে কয় রাকা’আত তারাবীহ তাহার ছুটিয়া গিয়াছে তাহা সে তারাবীহ এবং বেৎর জমা’আতের সঙ্গে পড়িয়া তারপর পড়িবে, জমা’আতের বেৎর ছাড়িবে না। (যদি কয়েক জনের কিছু তারাবীহ ছুটিয়া থাকে, তাহারা পরে জমা’আত করিয়াও তাহা পড়িতে পারে এবং শেষ রাত্রেও পড়িতে পারে।)

৬।মাসআলাঃ রমযান শরীফের পুরা মাসে তারাবীহর মধ্যে তরতীব অনুযায়ী একবার কোরআন শরীফ খতম করা সুন্নতে মোয়াক্কাদা। লোকের অবহেলা বা অলসতার কারণে এই সুন্নত পরিত্যাগ করা উচিত নহে। কিন্তু যে সব লোক একেবারেই অলস, কোরআন খতমের ভয়ে হয়ত তাহারা নামাযই ছাড়িয়া দিতে পারে, তাহাদের জন্য সূরা তারাবীহর জমা’আত করিয়া দেওয়া যাইতে পারে। সূরা তারাবীহর মধ্যে কোরআনের যে কোন অংশ বা যে কোন সূরা পড়িলেই চলে। প্রত্যেক রাকা’আতে ক্বূলহুআল্লাহ সূরা পড়িলেও জায়েয আছে, অথবা যদি ‘সূরা ফীল’ হইতে ‘সূরা নাস’ পর্যন্ত দশটি সূরার দ্বারা দশ রাকা’আত পড়িয়া, আবার দ্বিতীয় বার ‘সূরা ফীল’ হইতে ‘সূরা নাস’ পযৃন্ত পড়িয়া বাকী দশ রাকা’আত পড়ে, এ নিয়মও মন্দ নয়।

৭।মাসআলাঃ তারাবীহর জমা’আতে সম্পূর্ণ রমযান মাসে কোরআন শরীফ এক খতমের বেশী পড়িবে না। অবশ্য যদি মুছল্লিগণের অতিশয় আগ্রহ হয়, তবে বেশী পড়াতেও ক্ষতি নাই। (আমাদের ইমাম আ’যম ছাহেব প্রত্যেক রমযান শরীফে কোরআন শরীফ ৬১ বার খতম করিতেন; ৩০ দিনে ৩০ খতম, ৩০ রাত্রে ৩০ খতম এবং তারাবীহর মধ্যে এক খতম ইহাতে তাঁহার মোট ৬১ খতম হইত।)

৮।মাসআলাঃ এক রাত্রে কোরআন শরীফ খতম করা জায়েয আছে, কিন্তু যদি (লফয ছাড়িয়া বা কাটিয়া কাটিয়া পড়ে কিংবা) লোকের কষ্ট হয়, বা অভক্তি প্রকাশ পায়, তবে মকরূহ।

৯।মাসআলাঃ তারাবীহর খতমের মধ্যে পূর্ণ কোরআন শরীফের যে কোন একটি সূরার শুরুতে [আরবি] জোরে পড়া চাই, নতুবা পূর্ণ কোরআন খতমের ছওয়াব মিলিবে না, এক আয়াত কম থাকিয়া যাইবে। যদি হাফেয ছাহেব চুপে চুপে পড়িয়া নেন, তবে হাফেয ছাহের কোরআন পুরা হইয়া যাইবে বটে, কিন্তু মুক্তাদীদের এক আয়াত কম থাকিয়া যাইবে। অতএব, খতম তারাবীহর মধ্যে যে কোন একটি সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে পড়িচেব। (সাধারণতঃ আলেমগণ সূরা-আলাক্ক এর পূর্বে বিসমিল্লাহ আওয়ায করিয়া পড়িয়া থাকেন।)

১০।মাসআলাঃ সম্পূর্ণ রমযান মাসে প্রত্যেক রাত্রে বিশ রাকা’আত করিয়া তারাবীহ পড়া সুন্নতে মোয়াক্কাদা, যে সন্ধ্যায় রমযানের চাঁদ দেখিবে সেই রাত হইতেই তারাবীহ পড়া শুরু করিবে এবং যে সন্ধ্যায় ঈদের চাঁদ দেখিবে সেই রাত্রে ছাড়িবে। যদি কোরআন আগে খতম হইয়া যায়, তবুও অবশিষ্ট রাতগুলিতেও তারাবীহ পড়া সুন্নতে মোয়াক্কাদা (সূরা তারাবীহ হইলেও পড়িবে) কেহ কেহ কোরআন খতম হইয়া গেলে জমা’আতে আসে না বা তারাবীহ পড়ে না বা কেহ আট রাকা’আত পড়িয়াই চলিয়া যায় ইহা তাহাদের ভুল। (ইহাতে তাহারা গোনাহগার হইবে।)

১১।মাসআলাঃ তারাবীহর মধ্যে কোরআন খতমের সময় যখন ক্বুলহুআল্লাহ [আরবি] সূরা আসে, তখন এই সূরা তিনবার পড়া মকরূহ। (অর্থাৎ এইরূপ রছম বানাইয়া লওয়া এবং ইহাকে শরীঅতের হুকুম মনে করিয়া আমল করা মকরূহ, নতুবা নফল নামাযে বা তারাবীহর নামাযে উক্ত সূরা তিনবার করিয়া পড়া মকরূহ নহে।)

(তারাবীহর জমা’আত পুরুষদের জন্য সুন্নতে কেফায়া। অতএব, যদি সকলে মিলিয়া জমা’আত করে এবং কেহ ঘরে বসিয়া তারাবীহর নামায পড়ে, তবে সে জমা’আতের ছওয়াব পাইবে না বটে, কিন্তু গোনাহগার হইবে না। কিন্তু যদি পাড়ার সকলেই জমা’আত তরক করে তবে সকলেই গোনাহগার হইবে।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares