জানাযার নামায’র কিছু মাসআলা

দৈনিক সকালের ডাক

জানাযার নামায বাস্তবে আল্লাহ পাকের নিকট মৃত ব্যক্তির জন্য দোআ করা। (জীবিত লোকদের মধ্যে যাহারা মৃত্যুর সংবাদ পাইয়াছে তাহাদের উপর জানাযার নামায ফরযে কেফায়া।)

১।মাসআলাঃ অন্যান্য নামায ওয়াজিব হওয়ার যে সব শর্ত উপরে বর্ণিত হইয়াছে জানাযার নামায ওয়াজিব হওয়ার শর্তও তাহাই। অবশ্য ইহাতে একটি শর্ত বেশী আছে তাহা এই যে, উক্ত ব্যক্তির মৃত্যুর খবর জানা থাকা চাই, এই খবর যাহার জানা নাই সে অক্ষম। জানাযার নামায তাহার উপর যরূরী নহে।

২।মাসআলাঃ জানাযার নামায ছহীহ হওয়ার জন্য দুই প্রকারের শর্ত আছে। এক প্রকারের শর্ত মুছল্লির অন্যান্য নামাযের মত, যথাজায়গা পাক, জামা পাক, সতর ঢাকা, ক্বেবলা রোখ হওয়া, নিয়্যত করা। অবশ্য জানাযার নামাযের জন্য ওয়াক্তের শর্ত নাই এবং জানাযার জমা’আত ছুটিয়া যাইবার ভয়ে তায়াম্মুম করিয়া নামায পড়া জায়েয আছে। অন্যান্য জমা’আত বা ওয়াক্ত চলিয়া যাওয়ার ভয়ে তায়াম্মুম করিয়া নামায পাড়া জায়েয নাই।

৩।মাসআলাঃ জানাযার নামাযের মুছল্লী যে স্থানে দাঁড়াইবে সেই স্থান পাক না হইলে নামায ছহীহ হইবে না।

অতএব, যদি কেহ জুতা পায়ে দিয়া জানাযার নামায পড়ে, তবে জুতার উপর ও তলা এবং জুতার নীচের জায়গা পাক হইলে নামায হইবে, নতুবা নহে। আর যদি জুতা পা হইতে খুলিয়া জুতার উপর দাঁড়াইয়া জানাযার নামায পড়ে, তবে জুতার উপর এবং তলা পাক হওয়া চাই (নীচের জায়গা পাক না হইলেও চলিবে) অধিকাংশ লোক এদিকে খেয়াল রাখে না, কাজেই নামায হয় না।

জানাযার নামায ছহীহ হওয়ার জন্য দ্বিতীয় প্রকারের শর্ত মাইয়্যেত সম্পর্কে ছয়টি (১) মাইয়্যেত মুসলমান হওয়া। মাইয়্যেত কাফির বা মুরতাদ হইলে নামায জায়েয নহে। মুসলমান যদি ফাসেক বা বেদআতীও হয়, তবুও নামায জায়েয হইবে; কিন্তু মুসলমান বাদশাহর বিদ্রোহী বা ডাকাত যদি বিদ্রোহের বা ডাকাতির অবস্থায় মারা যায় তবে তাহাদের জানাযা পড়া যাইবে না; যুদ্ধের পরে বা স্বাভাবিক মৃত্যুতে মারা গেলে জানাযা পড়া যাইবে। এইরূপে যদি কোন দুরাচার তাহার পিতা বা মাতাকে হত্যা করে, এবং ইহার সাজা স্বরূপ সে মারা যায়, তবে শাসনের জন্য তাহারও জানাযা পড়া যাইবে না। ইচ্ছাপূর্বক যে আত্মহত্যা করে তাহার জানাযা ছহীহ ক্বওল মতে পড়া যাইবে।

৪।মাসআলাঃ যে না-বালেগ ছেলে বা বাপ-মা মুসলমান, তাহাকে মুসলমানই ধরা যাইবে এবং তাহার জানাযা পড়া যাইবে।

৫।মাসআলাঃ মাইয়্যেতের অর্থ যে জীবিত জন্মগ্রহণ করিয়া পরে মারা গিয়াছে; যাহার জন্মই হইয়াছে মৃতাবস্থায় তাহার জানাযা দুরুস্ত নহে।

২য় শর্ত (মাইয়্যেতের পক্ষে) এই যে, মাইয়্যেতের শরীর এবং কাফন পাক হওয়া চাই। (যে স্থানে মাইয়্যেতকে রাখা হইয়াছে সে স্থানও পাক হওয়া চাই এবং মাইয়্যেতের সতরও ঢাকা হওয়া চাই;) কিন্তু যদি (কাফন পরাইবার পর) মাইয়্যেতের শরীর হইতে কোন নাপাকী বাহির হয়, একারণে তাহার শরীর একেবারে নাপাক হইয়া যায়, তবে জানাযায় ব্যাঘাত জন্মাইবে না, নামায দুরুস্ত হইবে। (কাফন পরাইবার আগে বাহির হইলে ধুইয়া দিতে হইবে।)

৬।মাসআলাঃ মাইয়্যেতকে যদি গোসল দেওয়া না হয়, বা গোসল অসম্ভব হইলে তায়াম্মুমও করান না হয়, তবে জানাযা দুরুস্ত হইবে না। অবশ্য যদি গোসল এবং জানাযা ছাড়া মাটি দেওয়া হইয়া থাকে, তবে কবর আর খোঁড়া যাইবে না; কবরের উপরই জানাযা পড়িতে হইবে।

যদি ভুলে বা অজ্ঞতাবশতঃ কাহাকেও বিনা গোসলে জানাযা পড়িয়া কবর দেওয়া হইয়া থাকে, তবে ঐ নামায ছহীহ হয় নাই; পুনঃ কবরের উপর জানাযা পড়িতে হইবে। কেননা, এখন আর গোসল দেওয়া বা তায়াম্মুম করান সম্ভব নহে। কাজেই নামায হইয়া যাইবে।

৭।মাসআলাঃ কোন মুসলমানকে যদি বিনা জানাযায় কবর দেওয়া হয়, তবে কবরের উপরই তাহারা জানাযা পড়িতে হইবে। কিন্তু কত দিন পর্যন্ত কবরের উপর জানাযা পড়া যাইবে সে সম্বন্ধে ছহীহ মত এই যে, অনুমানে যতক্ষণ পর্যন্ত লাশ না ফাটে ততক্ষণ পর্যন্ত নামায পড়া যাইবে। কত দিনে যে লাশ ফাটে, তাহা দেশ, কাল পাত্র ভেদে বিভিন্ন হইয়া থাকে। কাজেই তাহার কোন সময় নির্দিষ্ট হইতে পারে না। এ সম্বন্ধে বহুদর্শী জ্ঞানীগণের মত গ্রহণ করিতে হইবে। কেহ তিন দিন, কেহ দশ দিন এবং এক মাস সময় ধার্য করিয়াছেন। (ইহা তাহাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতা অনুসারেই করিয়াছেন।)

৮।মাসআলাঃ মাইয়্যেতকে যে স্থানে রাখা হয় ঐ স্থানটি পাক হওয়া শর্ত নহে, মাইয়্যেত পাক খাটলির উপর থাকিলে, খাটলি রাখিবার জায়গা যদি পাক নাও হয়, তবুও নামায হইয়া যাইবে। কিন্তু যদি খাটলি নাপাক হয়, বা মাইয়্যেত নাপাক জায়গায় (খাটলি ছাড়া) রাখা হয়, তবে নামায ছহীহ হওয়া সম্বন্ধে মতভেদ আছে, কোন কোন আলেমের মতে মাইয়্যেতের স্থান পাক হওয়া শর্ত, কাজেই নামায হইবে না। কাহারও মতে শর্ত নহে, কাজেই নামায ছহীহ হইবে। (কিতাবে ছহীহ না হওয়ার উপরই জোর দেওয়া হইয়াছে।)

৩য় শর্ত (মাইয়্যেতের) এই যে, জানাযার নামায ছহীহ হওয়ার জন্য মাইয়্যেতের সতর ঢাকা হওয়া চাই। যদি মাইয়্যেত উলঙ্গ হয়, তবে নামায হইবে না। অবশ্য (জীবিতাবস্থায়) যে পরিমাণ ফরয, সে পরিমাণ সতর যদি ঢাকা হয়, তবে নামায হইবে।

৪র্থ শর্ত এই যে, মাইয়্যেত নামাযীদের সামনে হওয়া চাই। যদি মাইয়্যেত নামাযীর পিছনে থাকে তবে নামায হইবে না।

৫ম শর্ত এই যে, মাইয়্যেত অথবা মাইয়্যেতের খাটলি মাটিতে থাকা চাই। নামাযের সময় যদি মাইয়্যেত লোকের হাতের উপর, কাঁধের উপর বা গাড়ীর উপর রাখা থাকে, তবে নামায ছহীহ হইবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares