চীনা নারীরা যাকে দিয়ে ‘পুরুষ’ মাপেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চীনা নারীদের এমন প্রবণতাকে মোটেও ভালো চোখে দেখছেন না দেশটির অসংখ্য পুরুষ। চীনের পুরুষ শাসিত সমাজের কাছে ইয়াং লি’র কৌতুক অনেকটা হুমকির মতো।

লিঙ্গ সমতায় প্রেমিকের অবস্থান জানেন না অনেক প্রেমিকাই। তবে এ বিষয়টি জেনে নেয়ার একটি কৌশল খুঁজে পেয়েছেন চীনা নারীরা। এক্ষেত্রে তারা আজকাল প্রায়ই প্রেমিকের সামনে ইয়াং লি’র আলাপ জুড়ে দিচ্ছেন। আর তাতেই বেরিয়ে আসছে রক্তমাংসের আড়ালে থাকা প্রেমিক পুরুষের আসল চেহারাটি।

কৌতুকের ছলে পুরুষকে উপহাস করে এই ইয়াং লি এখন নারীবাদী আইকনে পরিণত হয়েছেন। কলকাতার ‘মিরাক্কেল’-এর মতো চীনের জনপ্রিয় কৌতুক শো ‘রক অ্যান্ড রোস্ট’ মাতিয়ে তিনি এখন রীতিমত মহাতারকা।

কৌতুক শো’তে সাধারণত পুরুষেরাই আধিপত্য করেন। তবে গত বছর থেকে ‘রক অ্যান্ড রোস্ট’ কৌতুক শো’তে অংশ নিয়ে তারকাখ্যাতি পেয়েছেন বেশ কিছু চীনা নারী। তাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রাখতে হবে ইয়াং লি’কেই। কৌতুকের ছলে তিনি পুরুষকে এমনভাবে আক্রমণ করছেন যে, অনেকের আঁতে ঘা লাগছে।

‘পুরুষের আত্মবিশ্বাস কেমন?’ এমন প্রশ্নে সম্প্রতি তিনি এক বাক্যে সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়েছিলেন- ‘গড়পড়তা’। তার এই উত্তর চীনা নারীদের এতটাই মনপুত হয় যে, তা রীতিমতো এক মেমেতে পরিণত হয়।

কৌতুকের ছলে তিনি এমনও বলেছেন, কোনো পুরুষ প্রেমের প্রস্তাব দিলে মনে হয়, সেই পুরুষটি তাকে মারতে চাইছেন! এর মাধ্যমে তিনি মূলত চীনা সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত পারিবারিক সহিংসতার বিষয়টিকে ইঙ্গিত করেছেন।

এসব নিয়ে তীব্র সমালোচনা হলে ইয়াং লি বলেছিলেন, অসুখী অবস্থায় ‘উন্মাদ’ আর ‘উদাসীন’ হয়ে যায় পুরুষ, ঠিক নারীদের মতো!

পুরুষের প্রতি ইয়াং লি’র এমন ত্যাড়া ত্যাড়া কথা চীনের নারীবাদী আন্দোলনকে একটি নতুন ভাষা দিয়েছে। এতে একদিকে যেমন তার অসংখ্য ভক্ত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে শত্রুর সংখ্যাও। মজার ব্যাপার হলো- এই দুই কূলে থাকা মানুষেরা পারতপক্ষে একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্ব কিংবা প্রেম করতেও চাইছেন না।

উদাহরণও আছে ভুরি ভুরি। চলতি বছরের শুরুর দিকেই ইয়াং লি’কে নিয়ে তর্ক করে চার বছরের প্রেমিকের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছেন ওয়েন্ডি লিউ নামে ২৩ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।

ওয়েন্ডি লিউ যখন ইয়াংলির কৌতুকের প্রশংসা করতেন, তার প্রেমিক তখন এগুলোর তীব্র প্রতিবাদ করতেন। শুধু তাই নয়, প্রেমিকটি দাবি করেন চরমপন্থী নারীবাদীরা ওয়েন্ডির মগজধোলাই করে ফেলেছে।

ওয়েন্ডি লিউ-এর প্রেমিক শেষ পর্যন্ত মন্তব্য করেছিলেন- কোনো পুরুষই কোনো নারীবাদীর সঙ্গে ঘর করতে চাইবে না। আর চীনে গজিয়ে ওঠা সাম্প্রতিক নারীবাদকে তিনি বিদেশি শক্তির প্রভাব বলেও মন্তব্য করেছেন।

এ প্রসঙ্গে লিউ বলেন, ‘সে সময় আমার মনে হয়েছিল বিগত চারটি বছর আমি শুধু শুধু নষ্ট করেছি। ইয়াং লিকে ধন্যবাদ। কারণ তার জন্যই এই সম্পর্ক থেকে আমি বেরিয়ে এসেছি।’

শুধু ওয়েন্ডি লিউই নন, এ বছর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চঙকিং শহরে ক্রিস্টেন লিউ নামে ২০ বছরের আরেক শিক্ষার্থীও ইয়াং লি ইস্যুতে তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে প্রেমিককে ত্যাগ করেছেন। তার প্রেমিক ইয়াং লি’কে ‘অসুস্থ’ বলে গালি দিয়েছিলেন।

ভাইস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫৬টি রাষ্ট্রের মধ্যে চীনের অবস্থান ১০৭তম। অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাজনীতিতে নারী-পুরুষের অবস্থান বিবেচনায় প্রতিবছর এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

তবে, সাম্প্রতিক সময়ে কম বয়সী চীনা তরুণীদের মাঝে লিঙ্গ সমতার বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নারী নিপীড়নে উদ্ধুদ্ধ করে প্রচলিত এমন ধ্যান ধারণাগুলোকে তারা বাতিল করে দিচ্ছেন। পুরুষকে আক্রমণ করা ইয়াং লি এবং তার মতো চীনের অন্যান্য নারী কমেডিয়ানরা তাই অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।

তবে চীনা নারীদের এমন প্রবণতাকে মোটেও ভালো চোখে দেখছেন না দেশটির অসংখ্য পুরুষ। চীনের পুরুষ শাসিত সমাজের কাছে ইয়াং লি’র কৌতুক অনেকটা হুমকির মতো।

এ অবস্থায় কমেডিয়ান ইয়াং লি যেন নিজেই এক যুদ্ধক্ষেত্র। যেখানে চীনা নারী আর পুরুষেরা এসে একে অপরের সঙ্গে লড়াই করছেন।

গত বছর ইয়াং লির সমালোচকরা একজোট হয়ে হুমকি দিয়েছিলেন- তারা চীনা মিডিয়া ওয়াচডগে লি’র ব্যাপারে অভিযোগ করবেন। কারণ তিনি যাচ্ছেতাইভাবে পুরুষকে আক্রমণ করছেন আর নারী ও পুরুষের মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে দিচ্ছেন। গত মার্চে একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে ইয়াং লির সঙ্গে চুক্তি করার জন্য ইন্টেল-কে বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন কিছু রাগান্বিত পুরুষ।

তারা বিজ্ঞাপনটি তুলে নেয়ার জন্য সংস্থাটির প্রতি আহ্বানও জানিয়েছিলেন। তবে এর বিপরীতে চীনা নারীরাও দেশটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ওয়েইবো’তে এক হ্যাশটেগ আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এক্ষেত্রে তাদের ভাষ্যটি ছিল- ‘আমি একজন নারী, আমি ইয়াং লিকে সমর্থন করি।’

পুরুষকে মেপে দেখার জন্য চীনা নারীদের কাছে ইয়াং লি এখন একটা ফিল্টারের মতো। এমন মনোভব দেখিয়েছেন হংকংয়ে অবস্থান করা ২৭ বছরের চীনা নারী জয়েস ঝেংও। সম্প্রতি একটি ডেটিং অ্যাপে তার সঙ্গে এক চীনা যুবকের খুব দহরম-মহরম। শিগগির তারা দেখাও করবেন।

জয়েস পরিকল্পনা করেছেন, নারী নিয়ে সেই যুবকের ভাবনা জানতে প্রথম দেখাতেই তিনি ইয়াং লিকে নিয়ে তার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেবেন। সেই যুবকটি যদি লি’র প্রতি আক্রমণাত্মক হয় তবে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে নাকচ করে দেবেন।

জয়েস ঝেং বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইয়াং লিকে ঠিক মতো নিতে পারেনা, নারীকে কিভাবে সম্মান করতে হয় সে তা জানেনা।’

পুরুষ চেনার ক্ষেত্রে নারীদের এমন পদক্ষেপ নিয়ে সাম্প্রতিক শো’তেও কৌতুক করেছেন ইয়াং লি। বলেছেন, ‘যে গোটা কয়েক পুরুষ আমাকে পছন্দ করেন, সব নারীই দেখছি তাদের পছন্দ করে। তাই তো বলি, আমার কেন প্রেম হচ্ছে না!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares