করোনাভাইরাস ও বৈশ্বিক সচেতনতাঃ বিশ্লেষণমূলক মতামত

লেখকঃ
ডা. দেবাশিস্ দাশ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (হোমিও)।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর এ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন্ হোমিওপ্যাথি।
(জটিল রোগীর চিকিৎসা কেন্দ্র)।
ইন্টারন্যাশনাল মেম্বার (এলএমএইচআই, জার্মানী)।
ডাইরেক্টর (আন্তর্জাতিক বিষয়ক), হোমিওপ্যাথিক হেলথ্ এন্ড মেডিকেল সোসাইটি।

বর্তমানে সারাবিশ্ব করোনাভাইরাসের থাবায় কম্পিত, শঙ্কিত, ভীত ও মৃত্যুযোদ্ধা। চমকিত বিশ্ববাসী দীর্ঘদিন লকডাউনে থেকে ভবিষ্যত নিয়ে দেখছে অনিশ্চয়তার স্বপ্ন। এ কি নতুন ভাইরাসের উৎপাত, সারা বিশ্বকে করে দিচ্ছে লন্ডভন্ড! করোনা (কোভিড-১৯) ভাইরাস যা আসলে SARS-COV-2 ভাইরাস। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই কি করোনা ভাইরাস প্রথম চিহিৃত হয়? ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়ো-টেকনোলজী ইনফরমেশন (এনসিবিআই) এর তথ্যানুসারে ১৯৬০ সালে মানবদেহে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। যা শিশুদের Upper Respiratory Tract Infection এর জন্য দায়ী ছিল। কাজেই ভাইরাসটিকে একেবারে নতুন বলা যায় না। ২০০৩ সাল থেকে কমপক্ষে ৫টি নতুন মানব দেহের করোনা ভাইরাস চিহিৃত করা হয়। এক গবেষণা অনুসারে পৃথিবীতে ৩,২০,০০০ ভাইরাস রয়েছে যেগুলো স্তন্যপায়ীদের আক্রমণ করতে সক্ষম। তন্মধ্যে ২১৯ টি ভাইরাস এ পর্যন্ত চিহিৃত হয়েছে (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়ো-টেকনোলজী ইনফরমেশন (এনসিবিআই) এর তথ্যানুসারে) বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে। ২১৯ টি ভাইরাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মরণঘাতী যে ভাইরাসগুলোর নাম বিভিন্ন সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত হয় এগুলো হচ্ছে – Nipha, Dengue, Chikungunya, H1N1, HIV ইত্যাদি এবং বর্তমানে COVID-19. প্রতিটি ভাইরাসই সংক্রামক এবং সংক্রমনের ধরণ হয়তো ভিন্ন।

করোনা ভাইরাস দ্বারা একজন মানুষ আক্রান্ত হলে যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় বা পেতে পারে যেমন – জ্বর, সর্দি, শুকনো কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় সকলেই গণমাধ্যমের বদৌলতে এ সকল লক্ষনের কথা অবগত হয়ে গেছেন। এছাড়াও আরো নতুন কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যেমন- পায়ের আঙ্গুলে লালচে র‌্যাশ। করোনা ভাইরাস গলা থেকে অন্ননালী দিয়ে পাকস্থলী হয়ে যদি অন্ত্রে চলে যায় তাহলে Intestinal Upset এর কারণে পাতলা পায়খানাও হতে পারে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে একজন মানুষের মধ্যে যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এ ধরণের লক্ষণ কোনটিই আমাদের কাছে নতুন নয়। আগেও মানুষের জ্বর, সর্দি-কাশি, গলাব্যথা কিংবা শ্বাস-কষ্ট হয়েছে

। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কারো কারো পাতলা পায়খানা কিংবা শরীরে লালাচে র‌ র‌্যাশও হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো – একজন মানুষের মধ্যে এ ধরণের কোন লক্ষণ পরিলক্ষিত হলে আমরা কোন ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে ধরে নিবো? হ্যাঁ এ মুহুর্তে উত্তর হলোঃ RT-PCR (Reverse transcription Polymerase Chain Reaction) Test এর রিপোর্ট যদি পজিটিভ আসে, তাহলে ধরা হচ্ছে করোনা আক্রান্ত। তাহলে আমাদের RT-PCR Test সম্পর্কেও কিছুটা প্রাথমিক ধারণা থাকলে ভাল হয়। বিবিসি নিউজের একটা আর্টিকেলে প্রকাশিত স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যানুসারে, “RT PCR” test, widely used in medicine to diagnose viruses such as HIV and influenza, are normally highly reliable.
PCR Test এর মাধ্যমে ভাইরাসের জেনেটিক কোডকে Match করানো হয়। ভাইরাসের এই জেনেটিক কোডটিকে বলা হয় প্রাইমার। যদি এই প্রাইমার, একজন আক্রান্ত ব্যক্তির স্যাম্পল কোডের সাথে মিলে যায়, তাহলে ধরে নেয়া হয় ব্যক্তিটি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। আর যদি ভাইরাসের জেনেটিক কোড Match না করে কিংবা Poorly Match করে, তাহলে PCR Test এর ফলাফল নেগেটিভ আসে।

যেই জেনেটিক কোডকে ভিত্তি করে PCR Test এর ফলাফলটি আসছে, হতে পারে ২১৯ টি চিহিৃত ভাইরাসের মধ্যে ইহা ইউনিক; কিন্তু ৩,২০,০০০ ভাইরাসের মধ্যে ২১৯ টি ভাইরাস বাদ দিয়ে বাকী যে ভাইরাসগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্যেও তো কোননা কোন ভাইরাসের একই জেনেটিক কোড থাকতে পারে। কাজেই PCR Test এর পজিটিভ ফলাফলে বর্তমানে করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত বলা হলেও, ভবিষ্যতে জেনেটিক কোডের সাথে মিলে যাওয়া ২১৯ টির বাইরে অন্য কোন ভাইরাসও হতে পারে। কাজেই করোনা আক্রান্ত শুনেই কি ভয়ে অর্ধেক মরে যাওয়া উচিত? তাহলে এই মুহুর্তে কেন আমরা ডেঙ্গুর কথা শুনলে অতটা ভয় পাচ্ছিনা? ডেঙ্গু কি চলে গেছে কিংবা ডেঙ্গুতে কি মানুষ মারা যায়নি? ডেঙ্গুরও নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। আর করোনা আক্রান্ত হলে যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পাচ্ছে, এগুলো কি আমাদের অপরিচিত লক্ষণ? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষণা অনুসারে, এখনো পর্যন্ত করোনার কোন ঔষধ বা ভ্যাকসিন নেই। যদিও ভ্যাকসিন নিয়ে ইতোমধ্যে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তবুও করোনা আক্রান্ত অনেক রোগীই জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থও হয়ে গেছেন। এটা আমার কথা নয়। প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, বিভিন্ন দেশে কতজন সুস্থ হয়েছেন। কাজেই আমরা করোনা শব্দটিকে খুব জটিলভাবে কিংবা ভয়ের সাথে মাথায় না রেখে, শুধু লক্ষণগুলোকে আগেরমত চিন্তা করলে এবং ঔষধ আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা নিলে সম্ভবতঃ আমাদের ভালই হবে। প্রায় প্রতিনিয়ত টেলিভিশনে বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন- আপনার জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে জ্বরের ঔষধ খাবেন, সর্দি-কাশি থাকলে তাও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে সর্দি-কাশির ঔষধ খাবেন। আমার এই লিখা পড়ে, অনেকে হয়তো চটে যাবেন কিংবা বলবেন আমি ভিত্তিহীন কথা বলছি। যেখানে সারা বিশ্বব্যাপী এত এত মানুষ মারা যাচ্ছে এবং সবাই আতঙ্কিত, আর আমি কিনা গল্প শুনাচ্ছি!

আসুন তাহলে আরেকটি তথ্য বলি। ২৪-০৪-২০২০ এর একটি অনলাইন দৈনিক পত্রিকার সংবাদ অনুসারে- এক গবেষণায় দেখা গেছে নিউইয়র্কের সবচেয়ে বেশী কোভিড-১৯ এর রোগী যারা দেখভাল করছেন, সেই নর্থওয়েল হেলথ্ এর অধীনে ভেন্টিলেশনে থাকা অধিকাংশ রোগীরই মৃত্যু হয়েছে। নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখন বিশ্বে সবচেয়ে বেশী নিউইয়র্কে। সিএনএন-এর তথ্যানুসারে নর্থওয়েল হেলথ্-এর অধীনে থাকা মারা যাওয়া ২১ শতাংশ করোনা রোগীর মধ্যে ৮৮ শতাংশেরই ভেন্টিলেশন ছিল।
কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য ভেন্টিলেশনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রব রব।

কারণ রোগীদের শ্বাসকষ্ট হলে ভেন্টিলেশনের মাধ্যমে ফুসফুসে বাতাস পৌঁছে দেয়া হয়। তাহলে এরা ভেন্টিলেশন থাকা সত্বেও কেন মারা গেলেন? আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশনের জার্নালে প্রকাশিত নর্থওয়েলের গবেষকদের গবেষণাপত্র হতে জানা যায়, নর্থওয়েলের প্রায় ৩ হাজার রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গুরুতর অসুস্থ এই রোগীদের বাঁচাতে ভেন্টিলেশন কোন ভূমিকা রাখছেনা। তথ্য বিশ্লেষন করে আরো দেখা গেছে, করোনা আক্রান্তদের মধ্যে যারা মারা গেছেন এবং যাদের ডায়াবেটিস ছিল, তাদেরই ভেন্টিলেটর কিংবা আইসিইউ সাপোর্ট লেগেছিল।

এই তথ্য থেকে তাহলে কি বুঝা গেল? যারা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কিংবা যাদের মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে, তাদের বেশীর ভাগেরই অন্যান্য কোন জটিলরোগ যেমন – ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা কিডনীরোগ মৃত্যুর জন্য দায়ী। তখন ভেন্টিলেশন সাপোর্টও সাহায্য করতে পারেনা।
আমার এই বিশ্লেষণমূলক লেখাটি কোন সমালোচনা নয়, নয় কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বলা কিংবা কোন দেশ বা সরকারের বিরুদ্ধেও বলা নয়।

পর্যবেক্ষণ সম্বলিত একান্তই সাধারণ মতামত। আর এই মতামতে প্রতিফলিত হয়েছে, করোনা একেবারে নতুন ভাইরাস নয় এবং ইহার লক্ষণ সমূহও একেবারে নতুন নয়। করোনা আক্রান্ত হলেই মৃত্যু নিশ্চিত-তা ভাবারও কারণ নেই। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েও মারা যেতে পারে, তাতে কিন্তু আমরা এই মুহুর্তে অতটা আতঙ্কিত হচ্ছিনা। কিন্তু ডেঙ্গুও পৃথিবী থেকে চলে যায়নি। করোনা চিকিৎসার ঔষধ আবিষ্কারের আগেই লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসায় করোনা আক্রান্ত রোগী ভাল হচ্ছে। যারা মারা যাচ্ছে বা গেছে, তাদের বেশীরভাগেরই অন্যান্য শারিরিক জটিলতা বিদ্যমান।

কাজেই চলুন আমরা আতঙ্কিত ও বিচলিত না হই বরং সচেতন হই। স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, লকডাউনে ঘরে থেকে শারিরিক ব্যায়াম করা এবং যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ কিংবা কিডনী রোগের মত জটিলরোগ রয়েছে – তাদের যথোপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলাই হবে উত্তম এবং মুক্তির উপায়। আসুন পরিবারের সদস্যদের সাথেও কিছুটা সময় বিনোদনে থেকে এবং মানসিক চাপমুক্ত থেকে সকলেই সুস্থ এবং নিরাপদ থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares