কক্সবাজারে মৃত্যুর ঘটনার হত্যাচেষ্টার মামলা হত্যা মামলায় রূপান্তরের চেষ্টা!

বেলাল আজাদ, কক্সবাজার প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের উত্তর সোনাইছড়ি ও পশ্চিম সোনাইছড়ি এলাকায় গত ৩ এপ্রিল দু’পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘটিত হামলা-পাল্টা হামলা এবং এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের হামলায় হার্টস্ট্রোক করে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নুরুল আবছার নান্নুর মাতা নুর নাহার বেগমের (৪২) মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যাচেষ্টায় জখম করার অপরাধের মামলাটি সরাসরি হত্যা মামলায় রূপান্তর হচ্ছে। নিহতের স্বামী আলী হোছাইন বাদী হয়ে ২৮ জনের নামে উখিয়া থানায় দায়ের করা জি.আর.-১৬৪/২০২০ (উখিয়া থানার মামলা নং-০৩, তাং-০৪/০৪/২০২০ ইং, (ধারা:১৪৩/৩৪১/৩২৩/ ৩২৫/ ৩০৭/৩৭৯/৫০৬ দন্ডবিধি) মামলায় ইতিমধ্যে ময়না তদন্ত প্রতিবদনও সম্পন্নের পর্যায়ে প্রায়। আলোচিত ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা, আইনগত ব্যাখ্যা এবং মামলাটির বাদী তথা রাষ্ট্রপক্ষের যথা পদক্ষেপে হত্যাচেষ্টায় জখম করার অপরাধে দন্ডবিধির ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৩৭৯/৫০৬ ধারায় রুজু হওয়া মামলাটিতে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলেই  দন্ডবিধির ৩০২ ধারা সংযুক্ত হয়ে হত্যা মামলা হিসেবে বিচার কার্যক্রম চলবে বলে আইনজ্ঞ সহ মামলা সংশ্লিষ্টদের মতামতে জানা গেছে। 

দেশের উচ্চ আদালতসহ কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের অনেক বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীগণের আইনী ব্যাখ্যা-মতামতে ও সংঘটিত সংঘটনায় নিহত ভিকটিম নূর নাহার বেগমের মৃত্যু সহ ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় হত্যা মামলার বদলে পুলিশের রুজুকৃত হত্যার উদ্দেশ্যেে জখম করার অপরাধেের মামলাটি চূড়ান্ত ভাবে হত্যা হিসেবেই রূপান্তর হবে।  

আইনী ব্যখ্যায়, ধারালো কোন অস্ত্রের  আঘাতে না হলেও আসামীদের মারধরসহ মানসিক আঘাতেই নুর নাহার বেগমের (স্ট্রোকে) মৃত্যু হয়েছে। সেটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনায় নয় বরং একই ঘটনায় ভিকটমের মৃত্যুবরণ, আসামীদের মারধরে ও মানসিক আঘাতের মৃত্যু হত্যা হিসেবেই বিবেচ্য হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অন্যের মানসিক আঘাতে কেউ মৃত্যুবরণ করলেও মানসিক আঘাতকারী খুনি হিসেবে অপরাধী এবং ঘটনায় হত্যা মামলাই হবে, তা যে কোন ধরনের অগ্নেস্ত্র বা ধারালো অস্ত্রের অথবা লাঠিসোটার বা খালি হাত/পায়ের কিংবা যে কোন ভাবে মানসিক আঘাতের দ্বারা যে কারও মৃত্যুই হত্যাকান্ড হিসেবে হিসেবেই বিবেচ্য।

বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নী জেনারেল এম.ডি. রেজাউল করিম সংঘটিত ঘটনা সহ মামলাটির পারিপার্শ্বিকতা ও আইনী ব্যাখা বিবেচনায়, ঘটনায় নিহত নূর নাহার বেগম কে হত্যা মামলার ভিকটিম গণ্য করে বলেন, ঘটনাটি সরাসরি হত্যাকান্ড রুজু না করে থানার দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা আইন ও ন্যায় বিচারে জটিলতা সৃষ্টি করেছেন। একই ভাবে সংঘঠিত ঘটনায় ভিকটিমের মৃত্যুকে সরাসরি হত্যাকান্ড হিসেবে গণ্য হবে বলে মতামত দিয়েছেন সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও ‘ফাইন্ড মাই এডভোকেট’র হেড এ্যাডমিন এডভোকেট হায়দর তানভির ও সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট দুলাল মল্লিক। কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইন কর্মকর্তা (পি.পি.) এডভোকেট ফরিদুল আলমও মানসিক আঘাতের মৃত্যুকে হত্যাকান্ড উল্লেখ করে বলেন, পুর্ব থেকে অসুস্থ কেউ হার্টস্ট্রোক করা আর কারও কোন মানসিক আঘাতে স্ট্রোক করে মৃত্যু বরণ করা এক নয়। সুস্থ কেউ মানসিক আঘাতে স্ট্রোক করে মারা গেলে, সেটা অবশ্যই হত্যা হিসেবে গণ্য হবে। একই মতামত দিয়েছেন সাবেক পিপি এডভোকেট নুরুল মোস্তফা মানিক, এপিপি তাপস রক্ষিত, সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, এডভোকেট মোঃ আবু তাহের, এডভোকেট রুহুল আমিন চৌধুরী রাসেল সহ অনেক বিজ্ঞ আইনজীবী। এদিকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ শামসুদ্দিন জানান, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত ভিকটিমের মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাবে না। তবে একই হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সার্জারী বিশেষজ্ঞ আরেক ডাক্তার জানান, কোন ভিকটিমের শরীরের বহিরাংশে আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও অনেক সময় দেহের অভ্যন্তরীণ আঘাতের আলামত মিলে। 

ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা উখিয়া থানার ও.সি (তদন্ত) মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম মজুমদার জানান, ভিকটিম নুর নাহার বেগমের ময়না তদন্ত রিপোর্ট এখনও হাতে আসেনি। ময়না তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা ক্রমে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ময়না তদন্ত রিপোর্ট ছাড়াও ঘটনার দিন ঘটনাস্থলে কি ঘটেছিল, তা খুব গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। 

নিহত নুর নাহার বেগমের স্বামী মামলাটির বাদী আলী হোসাইন বলেছেন, আমার স্ত্রী কে আসামীরা প্রকাশ্য দিবালোকে লাঠিসোটার আঘাত সহ লাথি-কিল, ঘুষিতে এলোপাতাড়ি মারধর করার ফলে ঘটনাস্থলেই আমার স্ত্রী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আসামীদের বিরুদ্ধে  সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্বেও থানা-পুলিশ নানা বাহানায় হত্যা মামলার বদলে মারধরের মামলা রুজু করেছে। আদালতের কার্যক্রম সচল হলে আমি আসামীদের বিরুদ্ধে মামলায় হত্যার ধারা সংযোজন করার আবেদন বা প্রয়োজনবোধে পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করব।

অপর পক্ষে ঘটনায় জড়িত ২৮ জন আসামীরা প্রায় প্রত্যেকেই আত্মগোপনে থাকায় তাদের সরাসরি  বক্তব্য নিতে না পারলেও নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ফোনালাপে, ভিকটিম নুরনাহার বেগম কে কেউ কোন ধরনের মারধর বা আঘাত করেনি দাবী করে বলেন, নিহতের ছেলে জালিয়াপালং ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নুরুল আবছার নান্নুর পক্ষের সন্ত্রাসী লোকজনই তাদের উপর উল্টো হামলা করে স্ট্রোকে মৃত নুর নাহার বেগমের স্বাভাবিক মৃত্যুকে হত্যা সাঁজিয়ে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে আমাদের হয়রানীর অপচেষ্টা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares