ওযূ নষ্ট হবার কিছু মাসআলা জানুন

সকালের ডাক

ওযূ নষ্ট হইবার কারণ

১। মাসআলাঃ মলমূত্র বাহির হইলে এবং পায়খানার রাস্তা দিয়া বাতাস বাহির হইলে ওযূ টুটিয়া যায়, আর যদি পেশাবের রাস্তা দিয়া কখনও বাতাস বাহির হয়, যেমন কোন কোন রোগের কারণে বাহির হইয়া থাকে, তাহাতে ওযূ টুটে না। আর যদি কোন পোকা বা পাথর বাহির হয় (তা চাই পায়খানার রাস্তা দিয়া বাহির হউক বা পেশাবের রাস্তা দিয়া) তবে ওযূ টুটিয়া যাইবে। ━কবীরী

২। মাসআলাঃ যখম বা কান হইতে পোকা বাহির হইলে ওযূ টুটে না। যখম হইতে কিছু গোশত কাটিয়া পড়িয়া গেলে রক্ত বাহির না হইলে, তাহাতে ওযূ টুটে না।

৩। মাসআলাঃ সিঙ্গা লাগাইয়া রক্ত বাহির করিলে, বা নাক দিয়া রক্ত আসিলে, কিংবা শরীরের অন্য কোন স্থান বা কোন ফোঁড়া-বাঘি হইতে রক্ত পুঁজ বাহির হইলে ওযূ টুটিয়া যাইবে, কিন্তু রক্ত যদি যখমের মধ্যেই থাকে, নির্গত স্থান হইতে বহিয়া না যায়, তবে ওযূ টুটিবে না। সুতরাং যদি হাতে সূচ বিদ্ধ হইয়া রক্ত বাহির হয় এবং এদিক ওদিক বহিয়া না যায়, তবে ওযূ যাইবে না। কিন্তু যদি এক বিন্দুও এদিক ওদিক গড়াইয়া যায়, তবে ওযূ টুটিয়া যাইবে। ━গুনইয়া

৪। মাসআলাঃ নাক ছাফ করিবার সময় যদি জমাট বাঁধা রক্ত বাহির হয় তবে তাহাতে ওযূ যাইবে না। কেননা, পাতলা তরল রক্ত বাহির হইয়া বহিয়া গেলে ওযূ টুটিয়া যায়। সুতরাং যদি নাকে আঙ্গুল দিলে তাহাতে রক্তের দাগ দেখা যায়, কিন্তু সে রক্ত বহিয়া না আসে, তবে তাহাতে ওযূ নষ্ট হইবে না। ━গুনইয়া

৫। মাসআলাঃ চোখে কোন দানা ছিল, তাহা ভাংগিয়া গিয়া পানি বাহিয়া গিয়াছে, কিন্তু চোখের ভিতরেই রহিয়াছে, বাহিরে আসে নাই, তাহাতে ওযূ যাইবে না; কিন্তু বাহিরে আসিয়া থাকিলে ওযূ টুটিয়া যাইবে। এরূপ যদি কানের মধ্যে কোন দানা থাকে আর পুঁজ বা রক্ত বাহির হয়, তবে দেখিতে হইবে যে, রক্ত বা পুঁজ যদি গোসলের সময় যে-পর্যন্ত ধোয়া ফরয সে পর্যন্ত না আসিয়া থাকে, তবে ওযূ যায় নাই, আর যদি সে পর্যন্ত আসিয়া থাকে, তবে ওযূ টুটিয়া গিয়াছে। ━গুনইয়া

৬। মাসআলাঃ ফোঁড়া বা ফোস্কার উপরের চামড়া উঠাইয়া ফেলিলে যদি ভিতরে রক্ত বা পুঁজ দেখা যায় কিন্তু বাহিয়া বাহিরে না আসে, তবে ওযূ যায় না, বাহিরে বাহিয়া আসিলে ওযূ টুটিয়া গিয়াছে। ━গুনইয়া

৭। মাসআলাঃ ফোঁড়া ইত্যাদির যখম খুব গভীর হইলেও যে-পর্যন্ত রক্ত বা পুঁজ মুখের বাহিরে না আসে সে পর্যন্ত ওযূ যায় না।

৮। মাসআলাঃ ফোঁড়া বা বাঘির রক্ত নিজে বাহির হয় নাই, যদি টিপিয়া বাহির করা হইয়া থাকে এবং যখমের বাহিরে বাহিয়া যায়, তবে ওযূ টুটিয়া যাইবে।

৯। মাসআলাঃ কাহারও যখন হইতে একটু একটু করিয়া রক্ত বাহির হইতেছে আর সে তাহার উপর মাটি ছড়াইয়া দিতেছে বা কাপড় দিয়া মুছিয়া ফেলিতেছে যাহাতে রক্ত বাহিয়া এদিকে ওদিকে না যাইতে পারে, তবে এখন তাহার চিন্তা করিয়া দেখিতে হইবে যে, যদি সে না মুছিত, তবে রক্ত বাহিয়া যখমের মুখ হইতে ছড়াইয়া পড়িত কি না যদি ছড়াইয়া পড়িত বলিয়া বোধ হয়, তবে ওযূ টুটিয়া যাইবে, যদি এরকম বিশ্বাস হয় যে, না মুছিলেও রক্ত এত কম ছিল যে, এদিক ওদিকে ছড়াইত না, তবে ওযূ যাইবে না। ━কবীরী

১০। মাসআলাঃ থুথুর সঙ্গে রক্ত দেখা গেলে যদি উহা নেহায়েত কম হয় বর্ণ সাদা বা হলদে রঙ্গের মত হয়, তবে ওযূ যাইবে না; আর যদি রক্ত বেশী হয় এবং লাল রঙ্গের মতন হয়, তবে ওযূ টুটিয়া যাইবে। ━কবীরী

১১। মাসআলাঃ দাঁত দ্বারা কোন জিনিস চিবাইতে সেই জিনিসের উপর রক্তের দাগ দেখা গেল, কিন্তু থুথুর সঙ্গে আদৌ রক্তের রং দেকা গেল না ইহাতে ওযূ যাইবে না।

১২। মাসআলাঃ জোঁক লাগাইলে যদি উহা এত পরিমাণ রক্ত পান করিয়া থাকে যে, জোঁকটাকে কাটিয়া ফেলিলে রক্ত বাহিয়া পড়িবে, তবে ওযূ টুটিয়া যাইবে। যদি সামান্য মাত্রায় পান করিয়া থাকে, তবে ওযূ যাইবে না। মশা, মাছি বা ছারপোকায় যে রক্ত পান করিয়া থাকে, তাহাতে ওযূ যায় না। ━গুনইয়া

১৩। মাসআলাঃ যদি কানের মধ্যে বেদনা অনুভব হয় এবং পানি বাহির হয়, যদিও কোন ফোঁড়া ফুঁসি অনুভব না হয়, তবুও এরকম পানি নাপাক, উহা কানের ছিদ্রের বাহিরে এমন জায়গা পর্যন্ত আসিলে ওযূ নষ্ট হইবে যাহা ওযূর মধ্যে ধোয়া ফরয। যদি নাভিস্থান হইতে পানি বাহির হয় এবং বেদনাও অনুভব হয়, তবে তাহাতে ওযূ নষ্ট হইবে কিংবা যদি চক্ষু হইতে পানি বাহির হয় এবং বেদনাও হয়, তবে তাহাতে ওযূ নষ্ট হইবে, অন্যথায় শুধু চোখ দিয়া পানি বাহির হইলে ওযূ যাইবে না। ━শরহে তানবীর-১

১৫। মাসআলাঃ বমিতে ভাত পানি বা পিত্ত বাহির হইলে যদি মুখ ভরিয়া আসিয়া থাকে, তবে ওযূ যাইবে। মুখ ভরিয়া না আসিলে ওযূ টুটিবে না, (মুখ ভরিয়া আসার অর্থ, মুখের মধ্যে সামলাইয়া রাখা কষ্টকর হইয়া পড়ে এই পরিমাণ) মুখ ভরিয়া কফ বমি করিলে ওযূ যাইবে না। বমিতে প্রবহমান তরল রক্ত বাহির হইলে ওযূ টুটিয়া যাইবে, তাহা মুখ ভরিয়া আসুক বা কম আসুক জমাট রক্ত মুখ ভরিয়া বাহির হইলে ওযূ নষ্ট হইবে, অন্যথায় ওযূ যাইবে না। ━কবীরী

১৬। মাসআলাঃ অল্প অল্প করিয়া বমি হইলে যদি সমস্ত বমি একত্র করিলে এত পরিমাণ হয় যে, সেই সব একবারে হইলে মুখ ভরিয়া যাইত, তবে যদি একবারের উদ্বেগে সেই সব বমি হইয়া থাকে, তবে ওযূ টুটিয়া যাইবে। আর যদি প্রথমবারের উদ্বেগ সম্পূর্ণ চলিয়া গিয়া বমন ভাব দূর হইয়া আবার উদ্বেগের সহিত সামান্য বমি হয় এবং দ্বিতীয় বারের উদ্বেগ থামিয়া গেলে তৃতীয় বার আবার নতুন উদ্বেগ হইয়া সামান্য বমি হইয়া থাকে, তবে এই সব যোগ করা হইবে না এবং ওযূও যাইবে না।

১৭। মাসআলাঃ শুইয়া শুইয়া সামান্য কিছু ঘুমাইলেও ওযূ টুটিয়া যাইবে, আর যদি কোন বেড়া বা দেওয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়া বসিয়া বসিয়া ঘুমাইয়া থাকে, তবে যদি নিদ্রা এত গাঢ় হইয়া থাকে যে, ঐ বেড়া বা দেওয়াল সেখানে না থাকিয়া ঘুমের ঝোঁকে পড়িয়া যাইত, তবে ওযূ টুটিয়া যাইবে। নামাযে দাঁড়ান অবস্থায় ঘুমাইলে ওযূ যায় না, (কিন্তু কোন রোকন নিদ্রিতাবস্থায় আদায় করিলে তাহা দোহরাইতে হইবে) সজদা অবস্থায় (বিশেষ করিয়া স্ত্রীলোকদের) ঘুম আসিলে ওযূ টুটিয়া যাইবে। ━রদ্দুল মোহতার

১৮। মাসআলাঃ নামাযের বাহিরে কোন বেড়া বা দেওয়ালে হেলান না দিয়া চুতড় দৃঢ়ভাবে চাপিয়া বসিয়া ঘুমাইলে তাহাতে ওযূ যাইবে না। ━কবীরী

১৯। মাসআলাঃ বসিয়া বসিয়া ঘুমের এমন তন্দ্রা আসিয়াছে যে, পড়িয়া গিয়াছে, তবে যদি পড়িবা মাত্রই সজাগ হইয়া থাকে, তবে ওযূ যাইবে না। আর যদি কিছুমাত্রও বিলম্বে জাগিয়া থাকে, তবে ওযূ যাইবে। আর যদি শুধু বসিয়া বসিয়া ঝিমাইতে থাকে, না পড়ে তবে ওযূ যাইবে না। ━শামী

২০। মাসআলাঃ সামান্য সময়ের জন্যও বেহুশ বা পাগল হইয়া গেলে ওযূ যাইবে। যদি তামাক ইত্যাদি কোন নেশার জিনিস খাইয়া এরকম অবস্থা হইয়া থাকে যে, ভালমতে হাঁটিতে পারে না, পা এদিক ওদিক চলিয়া যায়, তবে তাহাতেও ওযূ যাইবে। ━দুররুল মোখতার

২১। নামাযের মধ্যে এরকমভাবে হাসিলে, যাহাতে নিজেও শব্দ শুনিতে পায় এবং পার্শ্বস্থ লোকেও শব্দ শুনিতে পায় অর্থাৎ, হা হা (খল খল) করিয়া হাসিলে ওযূও যাইবে এবং নামাযও টুটিয়া যাইবে। আর যদি এরকমভাবে হাসে যাহাতে নিজেও আওয়াজ শুনিয়া শুনিয়া থাকে এবং অতি নিকটে যদি কেহ থাকে সেও শুনিতে পায় কিন্তু পার্শ্বস্থ লোকেরা সাধারণতঃ শুনিতে না পায়, তবে তাহাতে শুধু নামায টুটিবে ওযূ টুটিবে না। আর যদি হাসিতে আওয়াজ মাত্রও না হইয়া থাকে, শুধু ঠোঁট ফাঁক হইয়া দাঁত বাহির হইয়া থাকে, তবে তাহাতে ওযূও যাইবে না। ঐরূপ তেলাওয়াতের সজদার মধ্যে কোন বালেগ ছেলে বা মেয়ে খল খল করিয়া হাসিলেও তাহার ওযূ যাইবে না; তবে ঐ সজদা ও নামায আদায় হইবে না, পুনরায় আদায় করিতে হইবে। ━মুনিয়া

২২,২৩,২৪  ২৫ নম্বর মাসআলা ৫৯,পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য

২৬। মাসআলাঃ ওযূর পর নখ কাটাইলে বা যখমের উপরের মরা চামড়া খুটিয়া ফেলিলে তাহাতে ওযূর কোন ব্যাঘাত হয় না━ওযূ দোহরাইতে হইবে না বা শুধু সেই জায়গাটুকু ধোয়ারও কোন হুকুম নাই। ━শরহে তানবীর

২৭। মাসআলাঃ ওযূ করিয়া অন্য কাহারও ছতরে নযর পড়িলে বা নিজে৮র ছতর খুলিয়া গেলে তাহাতে ওযূ যায় না। হ্যাঁ, ঠেকা না হইলে অন্যের ছতর দেখা বা নিজের ছতর খোলা গোনাহর কাজ। ঐরূপ (অবরুদ্ধ গোসলখানায়) কাপড় খুলিয়া গোসল করিয়া ঐ কাপড় খোলা অবস্থায় যদি ওযূ করিয়া থাকে, তবে তাহাতেই ওযূ হইয়া যাইবে; পুনরায় ওযূ করিতে হইবে না। ━কবীরী

২৮। মাসআলাঃ যে জিনিস শরীর হইতে বাহির হইলে ওযূ টুটিয়া যায়, সে জিনিস নাপাক, আর যে জিনিস বাহির হইলে ওযূ যায় না, সে জিনিস নাপাক নহে। অতএব, যদি সামান্য এক বিন্দু রক্ত বাহির হইয়া থাকে আর যখমের মুখ হইতে ছড়াইয়া না যায়, বা সামান্য কিছু বমি হইয়া থাকে আর তাহাতে ভাত, পানি, পিত্ত বা জমাট রক্ত বাহির হইয়া থাকে, তবে ঐ রক্ত এবং বমি নাপাক নহে। সুতরাং উহা কাপড়ে বা শরীরে লাগিলে তাহা ধোয়া ওয়াজিব নহে। আর যদি মুখ ভরিয়া বমি হইয়া থাকে বা রক্ত যখমের মুখ হইতে ছড়াইয়া পড়িয়া থাকে, তবে তাহা নাপাক এবং উহা ধোয়া ওয়াজিব। যদি এই পরিমাণ বমি করিয়া গ্লাস, পেয়ালা বা বদনায় মুখ লাগাইয়া কুলি করিবার জন্য পানি লইয়া তাকে, তবে ঐ পাত্রগুলিও নাপাক হইয়া যাইবে। অতএব, সতর্ক হওয়া চাই। হাতে করিয়া পানি লইয়া কুলি করাই নিরাপদ। ━শামী

২৯। মাসআলাঃ শিশু ছেলে যে দুধ উদগীরণ করে তাহারও এই হুকুম, যদি মুখ ভরিয়া না আসিয়া থাকে, তবে নাপাক নহে। কিন্তু মুখ ভরিয়া আসিয়া থাকিলে উহা নাপাক। ━দুররে মুখতার

৩০। মাসআলাঃ ওযূর কথা বেশ স্মরণ আছে, কিন্তু তারপর ওযূ টুটিয়াছে কি না তাহা স্মরণ নাই; তবে শুধু এতটুকু সন্দেহে ওযূ যাইবে না। পূর্বের ওযূই আছে বলিয়া মনে করিতে হইবে। ঐ ওযূ দিয়া নামায পড়িলে নামায হইয়া যাইবে, তবে সন্দেহ স্থলে পুনরায় ওযূ করাই ভাল। ━দুররে মুখতার

৩১। মাসআলাঃ ওযূর সময় সন্দেহ হইল যে, অমুক জায়গা ধোয়া হইল কি না এমতাবস্থায় ঐ জায়গা ধুইয়া লইবে। ওযূর শেষে এইরূপ সন্দেহ হইলে কোন পরওয়া করিতে নাই। কিন্তু অমুক জায়গা ধোয়া হয় নাই বলিয়া নিশ্চিত বিশ্বাস হইলে সেই জায়গা ধুইয়া লইবে। ━শামী

৩২। মাসআলাঃ বে-ওযূতে কোরআন শরীফ ছোঁয়া জায়েয নহে। অবশ্য যদি ‍পৃথক কোন কাপড় দিয়া ধরে তবে জায়েয আছে। কিন্তু নিজের পরিহিত কাপড় বা কোর্তার আঁচল দিয়া ধরা জায়েয নহে। যদি মুখস্থ পড়ে, তবে বে-ওযূতেও জায়েয আছে, আর যদি কোরআন শরীফ সামনে খোলা থাকে, উহাতে হাত না লাগায়, তবে দেখিয়া পড়াও জায়েয আছে। এইরূপে যে সব তাবীযে বা তশতরিতে কোরআন শরীফের আয়াত লেখা থাকে তাহাও বে-ওযূতে ছোঁয়া জায়েয নহে। এই সামআলা খুব ভালভাবে মনে রাখিবে। ━দুররে মুখতার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares