ইমরানের ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন চেয়েছে হাইকোর্ট

নিউজ ডেস্ক

পুলিশের নির্যাতনে দুটি কিডনি নষ্ট হওয়া যশোরের কলেজছাত্র ইমরান হোসেনের (২৩) ডোপ টেস্টের (মাদক পরীক্ষা) প্রতিবেদন চেয়েছেন হাইকোর্ট।আগামী ৫ জুলায়ের মধ্যে প্রতিবেদন কোর্টে দাখিল করতে যশোরের সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব।

নির্যাতনের ঘটনায় ইমরানের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সিভিল সার্জন ও ঘটনার তদন্তের বিষয়ে পুলিশ সুপারের (এসপি) প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর (২৮ জুন) হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসানের ভার্চুয়াল বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদালতে আজ আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব। তাকে সহযোগিতা করেন আরেক রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস।

এর আগে গত ২৩ জুন রিটের শুনানি নিয়ে কিডনি নষ্ট হওয়া ইমরানের শারীরিক (স্বাস্থ্যগত) অবস্থা সম্পর্কে জানতে সেখানকার সিভিল সার্জন ও ঘটনার তদন্তের বিষয়ে পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে রিপোর্ট তলব করেছিলেন হাইকোর্ট। আজ সেটি উপস্থাপন করা হয়।

সমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, সিভিল সার্জনের প্রতিবেদনে এখন তার কিডনির ফাংশন নরমাল এবং হি ইজ ফিজিক্যালি ওয়েল বলে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইমরান হোসেনের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এরপর সেই ছাত্রের ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন চেয়েছেন হাইকোর্ট।

ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, ভিকটিম ইমরানের ডোপ টেস্ট করে তার রিপোর্ট এবং তার চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় আনুষঙ্গিক কাগজপত্র আগামী ৫ জুলাইয়ের মধ্যে হাইকোর্টে দাখিল করতে যশোরের সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

গত ১৮ জুন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব এবং ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওছার বিচারপতি জে বি এম হাসানের ভার্চুয়াল বেঞ্চে এ রিটটি করেন।

আবেদনে স্বরাষ্ট্র সচিব, যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি), যশোরের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং যশোরের সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়।

রিট আবেদনে বলা হয়, গত ৮ জুন যশোর জেলার সদর উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের নেছার আলীর ছেলে ইমরান হোসেনকে সাজিয়ালী পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ অফিসার কর্তৃক নির্মম প্রহারের কারণে তার দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে বলে পরদিন (৯ জুন) বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। ইমরান বর্তমানে যশোরের কুইন্স হসপিটালে চিকিৎসাধীন বলে জানা যায়, যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং ইমরানের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

রিট আবেদনে ইমরানের ওপর নির্মম প্রহারের ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্ত, ইমরানের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং তার যাবতীয় চিকিৎসা ব্যয়ভার বিবাদীদের বহন করার নির্দেশনা চাওয়া হয়।

ভুক্তভোগী কলেজছাত্র ইমরানের অভিযোগ, গত ৩ জুন সন্ধ্যায় তিনি সলুয়া বাজার এলাকা থেকে এক সঙ্গীসহ বাড়ি ফিরছিলেন। পথে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছালে সাজিয়ালি ফাঁড়ির পুলিশ তাদের ব্যাগ তল্লাশি করে। এ সময় ভয়ে ইমরান দৌঁড় দিলে পুলিশ সদস্যরা তাকে ধরে মারধর করে। পরে ইমরান জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তার জ্ঞান ফিরলে একটি ফার্মেসিতে নিজেকে দেখতে পান। এ সময় পুলিশ পকেটে গাঁজা দিয়ে তার বাবার কাছে ফোন করে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে ছয় হাজার টাকায় ছেড়ে দেয়। পরে বৃহস্পতিবার ভোরে ইমরানকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর বেসরকারি কুইন্স হসপিটালে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসকরা জানান, তার দুটি কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ৮ জুন বিষয়টি জানাজানি হলে তোলপাড় হয়। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম রব্বানি শেখের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

গত ১৫ জুন তদন্ত কমিটি পুলিশ সুপারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। তদন্ত কমিটি ইমরানকে নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা পায়নি।

ওইদিন যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্তে কলেজছাত্র ইমরানকে নির্যাতনের সত্যতা মেলেনি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছে ইমরানকে নির্যাতন করলে কিডনি হ্যামারেজ কিংবা ডেমারেজ হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হয়নি। আগে থেকেই তার কিডনির সমস্যা ছিল। এছাড়া তার শরীরে কোথায়ও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এদিকে ১৫ জুন প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে সাজিয়ালি পুলিশ ক্যাম্পের সেই ৪ পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করা হয়েছে। তারা হলেন- সাজিয়ালি ক্যাম্প ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুন্সি আনিচুর রহমান, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) সুমারেশ কুমার সাহা, এএসআই সাজদার রহমান ও কনস্টেবল ফারুক হোসেন।

যশোরের এসপি আশরাফ হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী কলেজছাত্রের অভিযোগ তদন্তে নির্যাতনের প্রমাণ মেলেনি। তবে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে কর্মস্থল ত্যাগ ও সাদা পোশাকে অভিযান পরিচালনা করায় তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares