ইবনে খালদুনের জীবনী

সকালের ডাক ডেস্ক

ইবনে খালদুন। পুরো নাম আবু জায়েদ আবদুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন খালদুন আল হাদরামি। তিনি ছিলেন একজন আরব মুসলিম পণ্ডিত। উইকিপিডিয়ায় প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও অর্থনীতির জনকদের মধ্যে তাকে অন্যতম বিবেচনা করা হয়। ১৩৩২ সালের ২৭ মে তিউনিসে খালদুনের জন্ম। মৃত্যু ১৪০৬ সালের ১৯ মার্চ কায়রোতে। ইবনে খালদুন তার বই মুকাদ্দিমার জন্য বেশি পরিচিত।

এই বই ১৭ শতকের উসমানীয় দুই ইতিহাসবিদ কাতিপ চেলেবি ও মোস্তফা নাইমাকে প্রভাবিত করে। তারা উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে এই বইয়ের তত্ত্ব ব্যবহার করেন। ১৯ শতকের ইউরোপীয় পণ্ডিতরা এই বইয়ের গুরুত্ব স্বীকার করেন এবং ইবনে খালদুনকে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দার্শনিকদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করতেন। হাফসিদ রাজবংশের অধীনে তার পূর্বপুরুষরা নিয়োজিত ছিলেন। খালদুনের পরিবারের অতি উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ থাকার বদৌলতে শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের কাছে তার পড়াশোনার সুযোগ হয়েছিল।

ক্লাসিক্যাল ইসলামি শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি কোরআন মুখস্থ করেছিলেন তিনি। রাজনীতিতেও জড়িয়েছিলেন। তার আত্মজীবনী দেখে মনে হয় এটি একটি অভিযাত্রার গল্প। তিনি বেশ কবার জেলও খাটেন। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে আসীন হন, আবার নির্বাসনে যান। মানবীয় জ্ঞানের মাত্রা প্রসঙ্গে ইবনে খালদুন : ইবনে খালদুন জ্ঞানের মাত্রাভেদ তত্ত্ব প্রবর্তন করেন। তিনি মানবীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রে যেমন ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি এবং আত্মিক অনুভূতির জগতের ক্রমিক অগ্রগতির কথা বলেছেন, তেমনি সাধারণ মানুষ, ওলি, নবী-রাসুলদের জ্ঞানের ক্ষেত্রেও এমন ক্রমিক মাত্রার কথা বলেছেন। তিনি দেখান যে, সাধারণ মানুষ সর্বোচ্চ আত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারে। মানুষ এ পর্যায়ে অতীন্দ্রিয় জগতের কিছু বিষয়াদি সম্পর্কে সামান্য কিছু অনুভব করে মাত্র।

কিন্তু কোনো সাধারণ মানুষের সে জগৎ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান হয় না। এই জগতের জ্ঞান আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া লাভ করা যায় না। কিন্তু এর থেকে জ্ঞানীয়ভাবে আর একটু অগ্রসর হয়ে যখন কোনো মানুষ আধ্যাত্মিক জগৎকে আরো বেশি করে অনুভব করতে পারে, তখন তারা ওলিদের পর্যায়ে অবস্থান করে। তবে ওলিরাও ঐ জগতের পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হন না। কেবল নবী-রাসুলগণই ঐ জগতের সম্যক উপলব্ধি করে থাকেন।

ইবনে খালদুন দেখান যে, বুদ্ধির জগতের ঊর্ধ্বে যে আত্মিক জগৎ সেই জগৎ মানুষের স্বাভাবিক সীমানার বাইরে। মানুষের জ্ঞানের পরিধি স্বাভাবিকভাবে এ জগৎ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। এ জগৎ সম্পর্কে সহজভাবে যারা অবহিত তারা হলেন ফেরেশতা। কেননা জন্মগতভাবেই আল্লাহ তাদের ঐ জগতের বাসিন্দা করে সৃষ্টি করেছেন। তাই তাদের কাছে ঐ জগতের জ্ঞানই স্বাভাবিক জ্ঞান। খালদুন দেখান যে, মানুষের মধ্যেও ফেরেশতার স্বভাব লুক্কায়িত থাকে।

মানুষের আত্মিক অনুভূতি প্রখর হয়ে উঠলে মানুষও ফেরেশতার জগতে প্রবেশ করতে পারে এবং এই পর্যায়ে মানুষ জগৎ জীবনের যে সকল যথার্থ জ্ঞান পায় তারই একটি বিশেষ স্তরকে প্রত্যাদেশ বলে। অর্থাৎ এই জগতে প্রবেশ করে মানুষ যখন আল্লাহর গায়েবি বাণী শ্রবণ করতে সক্ষম হন তখন তাকে প্রত্যাদেশ বলা হয়। নবীগণকে আল্লাহ এই ক্ষমতা দান করেছেন। তাই তাদের নিকট এটি একটি সহজাত প্রবৃত্তির মতো।

আল্লাহ নবী-রাসুলদের এই অনুগ্রহ দিয়েই সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের জীবনকে এই লক্ষ্যে আজন্ম পূত-পবিত্রভাবে সংরক্ষণ করেছেন। আল্লাহ নবী-রাসুলদের যে প্রত্যাদেশ প্রদান করেন তা সর্বক্ষণ বিদ্যমান থাকে না। এই অবস্থা ফেরেশতাদের মধ্যে সর্বক্ষণ বিদ্যমান থাকে। আল্লাহ তার ইচ্ছামতো নবী-রাসুলদের মাঝেমধ্যে প্রত্যাদেশ প্রদান করে থাকেন।

এই প্রক্রিয়ায় তারা যে জ্ঞান লাভ করেন সেই জ্ঞান অত্যন্ত সাবলীল এবং সুস্পষ্ট। এই জ্ঞান চরমভাবে বিশুদ্ধ, সুনিশ্চিত। জগতের কোনো জ্ঞানের সঙ্গে একে তুলনা করা যায় না। নবী-রাসুল সবার ওপর প্রত্যাদেশ নাজিল হলেও এর মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। নবীগণের তুলনায় প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির উৎকর্ষ এবং মাত্রা রাসুলদের ক্ষেত্রে আরো অধিক হয়ে থাকে।

তা ছাড়া রাসুলদের নিকট সরাসরি ফেরেশতা আসতেন। ফেরেশতারা মানুষের আকার ধারণ করে রাসুলদের নিকট আগমন করতেন এবং মানুষের মতো করে আল্লাহর বাণী রাসুলদের নিকট বলতেন। অর্থাৎ নবীদের ক্ষেত্রে কেবল আত্মিক অনুভূতির উচ্চতর পর্যায়ে প্রত্যাদেশ প্রাপ্তি ঘটত, এটা একটি গায়েবি বাণী শ্রবণের মাধ্যমে তারা বুঝতে পারতেন। কিন্তু রাসুলগণ একই সঙ্গে গায়েবি বাণী পেয়েছেন এবং ফেরেশতার সাক্ষাতের মাধ্যমেও ওহি পেয়েছেন। ইবনে খালদুন দেখান যে, শেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদও (সা.) এই উভয় প্রক্রিয়ায় আল্লাহর বাণী বা প্রত্যাদেশ লাভ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দেন। `হারেস ইবনে হিশাম একবার হজরত মুহাম্মদকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন: ‘কীভাবে আপনার নিকট ওহি আসে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘অনেক সময় এটা ঘণ্টাধ্বনির মতো আমার নিকট আসে- এটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। অতঃপর এটা শেষ হয় এমন অবস্থায় যে, আমি সমস্ত বক্তব্য স্মরণ করে ফেলেছি। অনেক সময় ফেরেশতা মানুষের আকার ধারণ করে আমার নিকট আসে ও কথা বলে। আমি সকল কথাই স্মরণ করতে পারি।’ নবী-রাসুলগণ প্রত্যাদেশ বা ওহি প্রাপ্তির সময় মূলত ফেরেশতাদের জগতের অধিবাসী হয়ে যান।

তাদের মানবীয় প্রকৃতির ঊর্ধ্বে তারা তখন অবস্থান করেন। কিন্তু এই অবস্থান ক্ষণকালীন। আবার তারা মানবীয় সত্তা ফিরে পান। ইবনে খালদুন বলেন, ‘মানবীয় সত্তার মধ্যেও ফেরেশতীয় সত্তায় রূপান্তরিত হওয়ার একটা যোগ্যতা বিদ্যমান থাকে। এর ফলে মানবিক সত্তা কোনো কোনো সময় ও বিশেষ কোন মুহূর্তে ফেরেশতীয় সত্তায় পরিণত হতে সক্ষম। এরপর পুনরায় সে মানবীয় সত্তায় প্রত্যাবর্তন করে এবং ফেরেশতীয় জগৎ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে স্বজাতির নিকট প্রচারের দায়িত্ব প্রদান করা হয়; এটাই প্রত্যাদেশ এবং ফেরেশতাদের বক্তব্যের যথার্থ মর্মার্থ। নবীগণ সকলেই এই সহজাত প্রবৃত্তির অধিকারী।`

ইতিহাসবেত্তা ও দার্শনিক ইবনে খালদুন : তিউনিসে জন্ম নেওয়া খালদুনের বেড়ে ওঠা সেখানেই, কিন্তু জীবনের পূর্ণতাপ্রাপ্তি হয় কখনো ফেজে, কখনো আন্দালুসিয়া তথা স্পেনে কখনো কায়রোয়। পুরো উত্তর আফ্রিকা চষে বেড়িয়েছেন তিনি। তার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন শুরু হয় তার বাবার কাছ থেকে। তারপর স্থানীয় তিউনিসীয় আলেমদের কাছে বিদ্যার্জন করেন। আন্দালুসিয়া থেকে হিজরত করে অনেক গুণী পন্ডিত, বিশেষজ্ঞ এসে তিউনিসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। বালক ইবনে খালদুন এদের সংশ্রব লাভ করেন।

আঠারো বয়স পর্যন্ত তার শিক্ষার্জনের কাল চলে। এ সময়েই মিসর থেকে মৌরিতানিয়া পর্যন্ত সমগ্র উত্তর আফ্রিকায় ভয়াবহ প্লেগ রোগ দেখা দেয়। ইবনে খালদুন নিজেই এর বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘কার্পেটের মধ্যে যা ছিল সবসুদ্ধই কার্পেটকে জড়িয়ে নিয়েছে এই মহামারি…ইন্তেকাল করেছিলেন আমার আব্বা এবং আমার মা-ও।’ তখন তিনি হিজরত করে মৌরিতানিয়া যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে বড় ভাই নিষেধ করায় আর যাননি। এরপর ডাক পেয়েছেন সুলতানের মোহররক্ষী হিসেবে কাজ করার জন্য, যখন তার বয়স বিশ বছরের নিচে। ইবনে খালদুনের পরের জীবন ছিল অনেকটাই অস্থিতিশীল। ইবনে খালদুন ছিলেন মূলত একজন ঐতিহাসিক। তার ইতিহাস গ্রন্থের মুকাদ্দামা তথা ভূমিকা তাকে কালজয়ী এক ঐতিহাসিকের আসনে সমাসীন করেছে।

তিন মুকাদ্দামা রচনা করেছিলেন ১৩৭৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যভাগে মাত্র পাঁচ মাসের পরিশ্রমে। এ মুকাদ্দামায় ইবনে খালদুন সমাজবিজ্ঞান জ্ঞানের এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন। ইবনে খালদুনের মতে, ইতিহাস শুধু ঘটনার সমষ্টি নয় বরং এটি গবেষণার উপযোগী একটি বিজ্ঞান। তিনি ইতিহাসের মাঝে দর্শনকে খুঁজে বের করেছেন। ইতিহাস বিশ্লেষণ প্রয়োগ করেছেন সমাজতত্ত্বে। এই বৈশিষ্ট্যের গুণে তিনি স্বতন্ত্র হয়েছেন পূর্ববর্তী ইতিহাস রচনাকারীদের থেকে।

ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে ইবনে খালদুন উদ্ভাবন করেছেন নতুন একটি পদ্ধতির। এই পদ্ধতির মৌল তত্ত্বগুলো পরবর্তী সময়ে সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি তার মুকাদ্দিমায় দাবি করেছেন-‘এতে নতুন ভিত্তির খোঁজ পাওয়া যাবে এবং এর বিষয় বস্তু আগ্রহোদ্দীপক।. …কোনো সমাজকে বিশ্লেষণ করতে হলে তার অবস্থা, বৈশিষ্ট্য, সময়ে সময়ে যেসব ঘটনা বা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং যেসব অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রশ্নই উঠে না- এই তিনিটি অবস্থাকে পৃথক করতে হবে।’ আবার তিনি তার সমাজতত্ত্বের পাঠ পরিক্রমার শুরুতে রেখেছেন নৃতত্ত্বের আলোচনা যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইবনে খালদুন সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাজ সম্পর্কে অধ্যয়ন ও গবেষণায় নিজেকে ব্যাপৃত করেছিলেন।

নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের আলোকে তিনি মানব সমাজ ও তার বৈশিষ্ট্যসমূহকে একটি নতুন জ্ঞানে রূপদান করেছিলেন। তিনি সমাজকে যাযাবর জীবনযাত্রা থেকে নগর ও রাষ্ট্রের পত্তনের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অবস্থা পর্যন্ত সকল পর্যায়ে ব্যবচ্ছেদ করে বিচার করার চেষ্টা করেছিলেন।

এ গবেষণায় তিনি মানব সমাজের দৃঢ়তা ও দুর্বলতা, নতুন ও পুরাতন যুগ, উত্থান ও পতনের দিকে সমান নজর দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি সমাজের সুপরিসর ভিত্তির ওপর ইতিহাসকে দাঁড় করিয়ে গেছেন, যা তার পূর্ববর্তীরা করেননি। ইবনে খালদুন সমাজ ও সভ্যতার উদ্ভব, বিকাশ ও প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি একটি সাধারণ তত্ত্বের ধারণা দেন।

অনুমান নির্ভর ধারণাকে বাদ দিয়ে পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, ঘটনা প্রবাহের বিশ্লেষণই উপযুক্ত পদ্ধতি। তিনি সাম্রাজ্যের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে পাঁচ ভাগে ভাগ করেন- ভূ-খণ্ড বিজয়, সাম্রাজ্য গঠন, সর্বোচ্চ স্তরে আরোহণ, শক্তি হ্রাস এবং পতন। ইবনে খালদুনের ধারণায় একটি রাষ্ট্র এই পাঁচটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। তার মতে মানুষ যেমন শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য, জরা ও মৃত্যুর মধ্যদিয়ে জীবন শেষ করে তেমনি রাষ্ট্রের জীবনেও শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য, জরা ও মৃত্যু প্রক্রিয়ার মধ্যে অতিবাহিত হয়। `মুক্কাদিমার দ্বিতীয় অংশে যাযাবর সমাজের স্থায়িত্ব ও শহুরে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির স্থায়িত্ব এবং শহুরে সমাজের সাথে যাযাবর সমাজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। এখানেই আমরা ইবনে খালদুন প্রদত্ত নতুন মতবাদ সম্পর্কে অবগত হওয়ার সুযোগ লাভ করি।

তিনি এখানে তার কথায় ‘আল আসাবিয়াহ’ তথা রাষ্ট্র বা বংশের স্থায়িত্বকাল সম্পর্কে বক্তব্য রেখেছেন। তাছাড়া এই অধ্যায়ে তিনি পরিবার ও অনুরূপ কোন সংস্থার উপর ভিত্তি করে পারিবারিক ও উপজাতীয় শক্তি ও প্রভাব গড়ে উঠেছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। ইবনে খালদুন সমাজকে দু`ভাগে ভাগ করেছিলেন, শহুরে সমাজ ও যাযাবর সমাজ।

এ দু`সমাজের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বিরোধকে তিনি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে উপজাতীয় সমাজের সদস্যরা মরুভূমি এলাকা ত্যাগ করে উর্বর ভূমিতে বসতি স্থাপন করে। প্রয়োজনের তাগিদে যাযাবর সম্প্রদায় নগর জয় করে এবং প্রতিষ্ঠিত সভ্যতাকে গ্রহণ করে। ইবনে খালদুন এমন এক যুগে জন্মেছিলেন যে যুগে ইসলামের শক্তি ও আধিপত্যে ভাঙ্গন শুরু হয়েছিল। ইসলামি চিন্তা ধারা হয়ে পড়েছিল অনাহুত, অবহেলিত। এজন্যে ইবনে খালদুনের রচনাবলী সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। পাশ্চাত্যে ইবনে খালদুন পরিচিত হন ১৬৯৭ সালে। এর প্রায় শতাব্দী পরে ১৮০৬ সালে ফরাসী প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ স্যাল ভেল্টার দ্য সাকি মুকাদ্দামার কয়েকটি পরিচ্ছেদ অনুবাদ সহ তার জীবনী ছাপেন। এরপর একজন অস্ট্রীয় প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ভন হ্যামার পার্গস্টল (Von Hammer Purgstall: Thar Hunderten der Hidschort) ইসলামি শক্তির পতন সম্পর্কে ১৮১২ সালে একটি পুস্তক প্রকাশ করেন।

এ পুস্তকে লেখক ইবনে খালদুনের রাষ্ট্রের পতন সম্পর্কীয় মতবাদ উল্লেখ করে তাকে ‘আরবীয় মন্টেস্কু (ফরাসি দার্শনিক)’ বলে অভিহিত করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপের গবেষকদের কাছে ইবনে খালদুন পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করেন। এবার পাশ্চাত্য জানতে পারল ইসলামের ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার এই মহান গুণী সম্পর্কে। কারণ তিনি ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে এমন সব অর্থনৈতিক, দার্শনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন যা পাশ্চাত্য জানতে পেরেছিল আরও কয়েক শতাব্দী পরে। তারা দেখতে পান ইবনে খালদুনের তত্ত্বগুলোই আলোচিত হয়েছে তার এক শতাব্দী পরে ম্যাকিয়ভেলির(১৪৬৯-১৫২৭) রচনায় এবং আরো তিন চার শতক পরের ভিকো (১৬৬৮-১৭৪৪), মন্টেস্কু (১৬৬৯-১৭৫৫), এ্যডাম স্মিথ (১৭২৩-১৭৯০), অগাস্ট ক্যোঁৎ (১৭৯৮-১৮৫৭) প্রমুখের রচনায়।

প্রথমে মনে করা হত পাশ্চাত্যের গবেষকরাই এ সব তত্ত্বগুলোর আবিষ্কর্তা। কিন্তু পরে গবেষণায় পাওয়া গেল গামবাতিস্তা ভিকোর পূর্বেই আরবীয় পন্ডিত ইবনে খালদুন ইতিহাসের দর্শন ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ভিকো নব বিজ্ঞান বা The new science বলে যে দাবি করেছেন তা আসলে উত্তর আফ্রিকার সেই রাজকর্মচারী ইবনে খালদুনের মাথায় ঢুকেছিল অনেক আগেই। অগাস্ট ক্যোঁৎ The new science নামে একটি শব্দ পাশ্চাত্যের অভিধানে সংযোজন করেন। কিন্তু তার পাঁচ শতাব্দী আগে প্রাচ্যের অভিধানে তা শোভা বর্ধন করেছিল। `আল উমরান` নামে একটি পরিভাষা। ইবনে খালদুন তার মতবাদসমূহ শুধু উপস্থাপন করেই ক্ষান্ত হননি, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সেসবকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

জার্মানির স্টুটগার্ট শহর থেকে ১৯০১ সালে T.J de Boer একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন যার নাম `Gesehicher Der philosophie in Islam` বইটিতে ইবনে খালদুন সম্পর্কে তার মতামত প্রকাশ করে দ্য বোয়ের উপসংহারে বলেছেন, গবেষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পরবর্তীকালে অন্য কেউ গবেষণা শুরু করুক, ইবনে খালদুনের সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে, তবে মুসলমানদের দ্বারা তা সম্ভব হয়নি। কোন পূর্ববর্তী মনিষীকে অনুসরণ না করেই যে প্রতিভাটির আবির্ভাব ঘটেছিল, সে প্রতিভাকে অনুসরণ করতে মুসলিম সমাজে কেউ এগিয়ে আসে নি। অধ্যাপক লুডউইগ গুমপ্লায়িজ বলেন, ‘ইবনে খালদুন কোন পরিবারের উত্থান-পতন সম্পর্কে `তিন বংশ স্তরের` যে ধারণা দেন তা এখন অটোকার লরেঞ্জের কৃতিত্বের ভান্ডারে।

অথচ লরেঞ্জের অনেক আগেই আরব দার্শনিক এই তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার ইবনে খালদুন সমর বিজ্ঞানের যেসব রীতি পদ্ধতি আলোচনা করেছিলেন ইউরোপীয়দের উত্থানের পুরো যুগে তাদের সেনাপতিরা সেসব রণকৌশল প্রয়োগ করেছেন। এছাড়া ম্যাকিয়াভেলি শাসকদের যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন শতবর্ষ আগে ইবনে খালদুনও তা-ই লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। অথচ তা কেউ জানত না।’

উপসংহারে বলেন- ‘শুধু অগাস্ট কোঁতেরই বহু বছর আগে নয় বরং ইতালীয়গণ যে ভিকোকে জোরজবরদস্তি করে প্রথম সমাজতত্ত্ববিদদের আসনে বসাবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছেন, তারও বহু বছর আগে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান সাফল্যের সাথে সমাজতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং এ বিষয়ে নিজের মতবাদ প্রকাশ করে গেছেন।

তিনি যা লিখে গেছেন আজ সেটাই আমরা সমাজতত্ত্ব বলে মনে করি।’ ছয় শতাব্দী আগে আরব চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইবনে খালদুন বলেছিলেন, ইতিহাস চক্রাকারে ঘোরে। একটি বংশধারার প্রতিনিধিত্ব তিন প্রজন্ম স্থায়ী হয়। এরপর তাদের সমৃদ্ধশালী যুগের অবসান ঘটে।

একটি বংশধারার অনুসারীদের মধ্যে অভিন্ন উদ্দেশ্যের চেতনা যত দিন উজ্জীবিত থাকে এবং যত দিন তারা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত থাকেন এবং তাদের মধ্যে সংহতি থাকে তত দিন তাদের অবস্থা ভালো থাকে। কিন্তু অপর একটি গ্রুপের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পর নতুন বংশধারার উন্মেষ ঘটার আলামত শুরু হতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক আরব বসন্তের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এ যে ইবনে খালদুনেরই তত্ত্ব। আসলে বিস্ময়কর প্রতিভাধর ইবনে খালদুনকে আমরা তেমন করে এখনো জানিনা। বিশ্বখ্যাত মুসলিম এই মনীষীকে এখনো অনেক জানার বাকী আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares