অতঃপর চব্বিশ বছর : তুহিন মাহামুদ

সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না।নির্দিষ্ট  আপন কক্ষে প্রতিনিয়ত ঘূর্ণায়মান।কিন্তু জীবনে খন্ড খন্ড সময়কে অতিক্রম করে পৌঁছে যাই এমন একটা জায়গায় সেখান থেকে পেছন ফেরা আর হয়ে ওঠেনা।সেই যে কবে ঘর ছেড়েছি,বাড়ি ছেড়েছি,শহর ছেড়েছি এমনকি একটা সময় প্রিয় জন্ম ভূমিও ছেড়েছি!

খন্ডিত সময়ের ফালিতে পা রেখে বয়সের বিভিন্ন ধাঁপ পেরিয়ে আজ এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছি।পিছন ফিরে দেখি ভোরের শিশিরসিক্ত কুয়াশার মতই ধূ-ধূ অস্পষ্ট এক দিগন্ত বিস্তৃত।মানব জগতের ভাষায় বলা হয় যাকে অতীত। সেই অতীতের আঁকা-বাঁকা পথে দেখি আপন মানুষের বিয়োগাত্মক করুণ সূর বাতাসে খেলা করে।অসংখ্য মুখাবয়ব ভেসে ওঠে হৃদয়ের আর্শিতে,ব্যথাতুর অন্তরে রক্ত চোখের দু’কূল প্লাবিত করে যাকে আমরা বলি চোখের জল।আজ সেই লোনা জলের উপস্হিতি টের পেলাম ঊষালগ্নে।
আজ থেকে চব্বিশ বছর পূর্বে( ১৩অক্টোবর ১৯৯৭ রাত নয়টা ত্রিশ মিনিটে) বাংলাদেশ বিমান বন্দর ত্যাগ করে ইউরোপের বুকে এসে পা রেখেছি।সেই যে পায়ের ছাঁপ লেগেছে তা আজও মুছতে পারিনি বরং আরও দিনে দিনে দাগ গুলো গাঢ় হয়ে উঠছে।

শৈশব কেটেছে কুমার নদীর পাড়ে খেলাধূলার মাঝে। আর কৈশোর কেটেছে আড়িয়াল খাঁ নদীর কোলে হেসে খেলে,যৌবনের সোনালি দিনগুলো কেটে গেলো ইউরোপের চাকচিক্যময় পথ-প্রান্তরে!
যৌবনের শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে নবীনের হাত ধরে চিলে কোঠায় উঠে মুক্ত আকাশটা মন ভরে উপভোগ করার জন্য লেখনির কার্ণিশে হাত রাখার চেস্ট করছি।
ছোটবেলা থেকেই কল্পনা বিলাসী মন লেখা-লেখির পিছনে ছোটা-ছুটি করতো,সেই সুবাধে দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনা,পত্রিকায় কবিতা লেখা,মঞ্চনাটক প্রমোট করা,স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করা,সাংবাদিকতার পেছনে ছুটে শর্টহ্যান্ড, টাইপরাইটিং, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ,বই পড়ার নেশায় পাবলিক লাইব্রেরিতে ছুটে যাওয়া,এমনকি সিনেমার হলে গিয়ে সিনেমা দেখা এগুলো নিত্যনৈমিত্তিক জীবনের একটি ধারা বয়ে যেত সেই ছাত্র জীবনে।
সাংবাদিকতার কথা লিখতে যেয়ে মনে পড়লো আমার প্রিয় বন্ধু কেমীর কথা যার উৎসাহ,অনুপ্রেরণায় লেখার জগতে নেমেছিলাম।সেই প্রথম লেখা কবিতা পত্রিকায় ছাপা,সেই প্রথম রির্পোট তৈরী করার প্রাণপণ চেস্টা।সাপ্তাহিক আঁড়িয়াল খাঁ পত্রিকার মাধ্যমে লেখার জগতে বিচরণ যা আজও অব্যাহত…………..!

পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সুবল বিশ্বাস দাদা যিনি দৈনিক জনকন্ঠেরও মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি ছিলেন আজও আছেন,হয়তো আঁড়িয়াল খাঁ পত্রিকাটি নেই সঠিক জানিনা।তবুও সেই প্রথম ভালোলাগা, ভালোবাসা আজও উষ্ণতা বাড়ায়। উদ্বুদ্ধ করে নতুন সৃষ্টির মূলে আঘাত করে ভগ্নাংশের ধারা মেলে দিতে বিশ্ব রৌদ্রজ্জ্বল উঠোনে।

জীবনের চাওয়া- পাওয়ার মাঝে কখনও কোন হিসেব কষিনি,স্রোতস্বিনী নদীর মত আপনমনে বিচরণ করেছি সমাজের স্তর বেয়ে কখনও রাজনীতির মাঠে,কখনও সামাজিকতার মাঠে আবার কখনও শিল্প সাহিত্য ও অভিনয় জগতে ছুটেছি ক্লান্তিহীন ভাবে সংবাদের খোঁজে।পত্রিকার সম্পাদনা আর লেখা-লেখিতে হাফিয়ে উঠতাম তবুও আনন্দ ও ভালোলাগার মাঝে কাটে দিন।

আজকের দিনটি জীবনের একটি গল্পের শিরোনামের মতই। ১৩ এই দুটি সংখ্যা জীবনে দু’টি ধারায় প্রবাহিত করেছে এই ১৩ তারিখে ভূবন থেকে ভবনে পা রেখে কুমারত্বের অবসান ঘটিয়ে অনবদ্য ছন্দের তালে গড়িয়ে গেছে অনেক গুলো বছর।প্রিয় শহর মিলানে কেটে গেছে প্রায় দুই যুগেরও বেশী, প্রিয় মানুষ গুলোও এই শহরের আঁনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো কিন্তুু জীবন ও জীবিকা তাগিদে সিংহ ভাগই এখন নঙ্গর গেরেছে ইংল্যান্ডে। অনেকটা ফাঁকাফাঁকা আর স্যাঁতসেঁতে মনে হয় বর্তমান সময়টাকে।বিশ্ব মহামারির প্রকোপে মানুষের অনুভূতির মূলে প্রচন্ডভাবে আঘাতের ফলশ্রুতিতে মন অনেকটা ভাঙ্গা বাসনের মতই অস্বস্তিকর শব্দ করে।তখন জীবনটাকে ভারবাহী ক্লান্ত পশুর মতই মনে হয়।পথের মাঝে পথহারা পথিকের মন যেভাবে বিচলিত হয়।

মাঝে মাঝে কালের সমিরণে বেতসলতার মত নড়ে ওঠে হৃদয়ের গভীরে,ঝরা পাতার মত নি:শব্দে মোচড় দিয়ে ওঠে বুকের মাঝে অতৃপ্ত বেদনায়।ভালোবাসি কবিতা আবৃত্তি শুনতে,আবৃত্তি করতে, লিখতে তাইতো সাথী হই কবিদের দলে।রবীন্দ্র সংগীত আমায় মুগ্ধ করে।অনুপ্রাণিত করে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা,লেখার সাহস সঞ্চার করে কিশোর কবি সুকান্ত ভট্রাচার্যের কবিতা।উদাসী মন বার বার ঘুরে বেড়াতে চায়, মুক্ত বিহঙ্গের মত আকাশ ও প্রকৃতির মাঝে ডানা মেলে উড় দিতে চায়।মানুষের সব আশা কি পূর্ণ হয় তবুও স্বপ্ন দেখতে মন চায়।মাঝে মাঝে খাঁচায় বদ্ধ রুমালীর মত মন ছটফট করে তাইতো মাঝে মাঝে ছুটে যাই সাগর,নদী আর লেকের ধারে।ছবি তুলতে ভালো লাগে,ভালো মানুষের ভালো কাজগুলো সবার সামনে তুলে ধরতে মন উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

আজ মনটা কেমন যেন আচানক। কি যেন নেই উদাসীনতায় পাগলা হাওয়ার মতই ছটফট করে অবাধ্য মন।বিগত দু’বছরে করোনায় অনেক পরিচিত জনকে চিরতরে হারিয়েছি মাঝে মধ্যে সেই মুখ গুলো ভেসে ওঠে।এক সময় এখানের সামাজিক, অরাজনৈতিক, পারিবারিক পরিবেশ ছিলো অনেকটা সুখ স্মৃতির মতই মধুময় এখন কেমন যেন পানসে ও আত্মকেন্দ্রিকতায় ভরে গেছে সমাজের প্রতিটি স্তর।

সকালে অনলাইলে প্রবেশ করতেই মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো।প্রিয় একজন মানুষের মৃত্যুর খবরটি যেন কানে এসে কুঠারাঘাত করলো।কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছিনা নুরমোহাম্মাদ মাষ্টার কাকা নেই।এই তো তিন বছর পূর্বে হাসিমুখে কথা বলেছে কুশলাদী জিজ্ঞেস করেছিলো ছোট বেলার বন্ধু একসাথে যার সাথে ছয়টি বছর স্কুলের আঙিনায় কাটিয়েছি তাঁর বাবা আর নেই।এ যেন আমার বাবার মৃত্যুর শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।জানিনা আর কত বেদনাহত জীবনের ক্লান্তিময় সময় পার করতে হবে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক তুহিন মাহামুদ (ইতালি প্রবাসী)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares